বাঘ বাঁচাতে সভা, অথচ সুন্দরবনের মাঝেই প্যান্ডেল, জেনারেটর

বাঘ সংরক্ষণের নামে সুন্দরবনের ভেতরে প্যান্ডেল, জেনারেটর ও সাউন্ডবক্স ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত হয় বন বিভাগের সচেতনতামূলক সভা। বৃহস্পতিবার টহল ফাঁড়ি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

যে সুন্দরবনের নিস্তব্ধতায় বাঘসহ নানা বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস, সেই বনের মাঝেই প্যান্ডেল খাঁটিয়ে, জেনারেটর ও সাউন্ডবক্স বসিয়ে সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করেছে বন বিভাগ। লোকালয়ে অনুষ্ঠান করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১২০ জন মানুষ নিয়ে বনের ভেতরে বাঘ ও বন সংরক্ষণের নামে এমন আয়োজন পরিবেশবাদী ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিস্ময় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সুন্দরবনের বজবজা টহল ফাঁড়ি এলাকায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানস্থলটি সুন্দরবনের ঝপঝোপিয়া ও শাকবাড়িয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। তবে অনুষ্ঠানের ব্যানারে স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয় কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন এলাকার নাম, যা লোকালয়ের মধ্যেই অবস্থিত।

অনুষ্ঠানের ব্যানারে সবার ওপরে লেখা ছিল, ‘বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের সমৃদ্ধি’। ব্যানারে আরও উল্লেখ করা হয়, বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন, সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকার এবং বিষ দিয়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের সহযোগিতায় এবং পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি জানান, বনবিভাগের ব্যবস্থাপনায় ট্রলারে করে নদীপথে তাঁদের সুন্দরবনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও বাওয়ালিদের অনেকেই নিজ নিজ নৌকা নিয়ে সভায় যোগ দেন। অংশগ্রহণকারীদের জন্য দুপুরে খাবারের আয়োজন করা হয়। কয়রা উপজেলা সদরের একটি হোটেল থেকে বিরিয়ানি প্যাকেট করে বনে নিয়ে যাওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের গেঞ্জি ও ক্যাপও দেওয়া হয়।

কয়রার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, একদিন আগে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন তাঁকে ফোন করে সভায় যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে দেখি অনুষ্ঠানস্থলের পাশ দিয়ে কয়েকটি বন্য শূকর ঘোরাফেরা করছে। ট্রলার থেকে নামতেই তারা দৌড়ে বনের ভেতরে পালিয়ে যায়। লোকালয় ছেড়ে বনের মধ্যে কেন এমন আয়োজন করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

বনজীবী জেলে তপন কুমার বলেন, ‘এর আগেও সচেতনতামূলক সভা হইছে, তবে সেগুলো লোকালয়ের মধ্যি অনুষ্ঠিত হুতো। এই প্রথম আমাগের বনের ভেতর আইনে বন কর্মকর্তারা বক্তব্য শোনাইছেন। প্যান্ডেলের মধ্যে সারিবদ্ধ চেয়ার পাইতে বইসে দুপুরে বিরিয়ানি খাওয়ানো হইছে। সব মিলায়ে একদিন বনের মধ্যে পিকনিকের মতোই মনে হইছে।’

অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে যুক্ত বন বিভাগের কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) কয়েক সদস্য জানান, কয়রা উপজেলা থেকে ডেকোরেটর ভাড়া করে সুন্দরবনের ভেতরে প্যান্ডেল করা হয়। সুন্দরবনে বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর ব্যবহার করা হয় এবং পুরো অনুষ্ঠানে সাউন্ডবক্স চালু ছিল। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁদেরও ট্রলারে করে অনুষ্ঠানস্থলে নেওয়া হয় এবং অনুষ্ঠান শেষে আবার লোকালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়।

খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ওলিউল্যাহ। এ ছাড়া সাংবাদিক, ভিটিআরটি ও কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) সদস্য এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও বাওয়ালিরাও অংশ নেন।

সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘লোকালয় থেকে ট্রলার ভরে মানুষ সুন্দরবনের ভেতরে নিয়ে গিয়ে এমন অনুষ্ঠান করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যেভাবে আয়োজন করা হয়েছে, তাতে সচেতনতা বৃদ্ধির চেয়ে বরং সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর চাপই বেশি পড়েছে। বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করে বাঘের আবাসস্থলে মানুষের সমাগম সৃষ্টি করা অনভিপ্রেত।’

কয়রা সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে মানুষের ভিড়, উচ্চ শব্দ, জেনারেটরের কম্পন ও আলো বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। সচেতনতা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ভালো হলেও আয়োজনের ধরন ও স্থান নির্বাচনে আরও সংযমী হওয়া প্রয়োজন ছিল।’

এ বিষয়ে সুন্দরবনের বজবজা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিব তালুকদার বলেন, ‘অনুষ্ঠানটি মূলত লোকালয়ে অবস্থিত কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন এলাকায় করার কথা ছিল। তবে আমার টহল ফাঁড়িটির অবস্থান মাঝামাঝি জায়গায় হওয়ায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। ভালোভাবে অনুষ্ঠান করতে প্যান্ডেল ও সাউন্ডবক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা হয়নি। শুধু বক্তব্য দেওয়ার জন্য মাইক্রোফোন ব্যবহার করা হয়েছে।’

খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষণ শরিফুল ইসলাম বলেন, অনুষ্ঠানটি মূলত জেলে ও বাওয়ালিদের নিয়ে সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে লোকালয়ে অনুষ্ঠান করলে নানা ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। লোকালয়ে করলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।’

তবে সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান লোকালয়েই হওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। বজবজা টহল ফাঁড়ি সুন্দরবনের ভেতরে অবস্থিত। সেখানে এ ধরনের আয়োজন ঠিক হয়নি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাতে সুন্দরবনের ভেতরে এ ধরনের অনুষ্ঠান না হয়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।’