এক বাগানে ৩০ জাতের আম, দেখতে এসে অনেকে চারাও খুঁজছেন
জ্যৈষ্ঠের দুপুর। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের একটি আমবাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে রঙের বাহার। কোনো গাছে ঝুলছে লালচে আভাযুক্ত আম, কোথাও বেগুনি রঙের, আবার কোথাও হলুদ কিংবা সবুজ। এক বাগানেই দেশি-বিদেশি নানা জাতের আমের এমন সমাহার দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ নতুন জাতের চারা সংগ্রহের খোঁজ করছেন।
বাগানটির মালিক হানিফ আলী মণ্ডল। প্রচলিত আম চাষের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে তিনি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন জাতের আম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে ৩০ জাতের আম আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই বিদেশি জাতের।
রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, কিছু গাছে ফলের ভারে ডাল নুইয়ে পড়েছে। বিদেশি জাতের অনেক আম আকার, আকৃতি ও রঙের দিক থেকে প্রচলিত জাতের আমের চেয়ে বেশ আলাদা। এসব আম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন।
বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলে আমের ভরা মৌসুম চলছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর। একই সঙ্গে পাকতে শুরু করেছে হাঁড়িভাঙ্গা আমও। তবে হানিফ মণ্ডলের আগ্রহ মূলত দেরিতে পাকে এমন জাতের আম নিয়ে।
হানিফ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, মে মাসে বাজারে আমের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু জুলাই কিংবা আগস্টে আমের সরবরাহ কমে গেলে দাম অনেক বেড়ে যায়। তাই তিনি এমন জাতের আম নিয়ে কাজ করছেন, যেগুলো মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসে। এতে চাষিরা তুলনামূলক বেশি লাভ করতে পারেন। তিনি বলেন, একই জমি ও পরিচর্যায় যদি পরে বেশি দাম পাওয়া যায়, তাহলে কৃষক লাভবান হবেন। সেই সম্ভাবনা তাঁরা যাচাই করছেন।
হানিফ মণ্ডল জানান, তাঁর বাগানে আম্রপালি, বারি আম–৪, গৌড়মতি, বারি আম–১১, হাড়িভাঙ্গা, বারি আম–১৬, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, খিরসাপাত, ফজলি, আশিনা, লক্ষণভোগ, কিউজাই, কিং অব চাকাপাত, চিয়াং মাই, রেড পামার, থ্রি টেস্ট, কেইট, টমি অ্যাটকিন্স, সূর্য ডিম, অম্বিকা, অস্টিন ম্যাঙ্গো, অরুনিকা, কাঁচামিঠা, ব্ল্যাক স্টোন, অল টাইম রেড, ল্যাংড়া, দুধসর, নাম ডক মাই (Nam Dok Mai) ও গোপালভোগ জাতের আম আছে।
শুধু আম নয়, হানিফ মণ্ডলের বাগানে আছে মাল্টা, আনার, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ধরনের ফল গাছ। বিশেষ করে হলুদ রঙের মাল্টা দেখতে অনেকেই বাগানে আসেন। ফলে বাগানটি ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে একটি দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে বাগান দেখতে এসেছিলেন সাব্বির রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরও আমবাগান আছে। এখানে বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম দেখতে এসেছি। গৌরমতি, মিয়াজাকি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো জাতগুলো ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে কয়েকটি জাতের চারা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা আছে।’
আরেক দর্শনার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহবুব আলম বলেন,‘ বাগানটি ঘুরে দেখে ভালো লাগছে। এখানে শুধু আম নয়, বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমরা নিজেরাও ভবিষ্যতে নতুন কিছু করার চিন্তা করছি। সেই আগ্রহ থেকেই দেখতে এসেছি।’
হানিফ মণ্ডল জানান, তাঁর বাগানে আসা অনেক দর্শনার্থী প্রথমবারের মতো লাল বা বেগুনি রঙের আম দেখেন। এ কারণে কৌতূহল থেকেই অনেক পরিবার বাগান দেখতে আসে। দর্শনার্থীদের কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন। আবার অনেকেই ফলের স্বাদ নিয়ে দেখেন।
নিরাপদ ফল উৎপাদনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন হানিফ। বাগানের অনেক আম বিশেষ কাগজের ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ফ্রুট ব্যাগিং’। বাগানে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক সকাল থেকে ব্যাগিংয়ের কাজ করছেন। প্রতিটি ফল আলাদা ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় মাছির আক্রমণ কমে। পাশাপাশি কীটনাশকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
হানিফ মণ্ডল বলেন, ব্যাগিং করলে ফল অনেক বেশি নিরাপদ থাকে। ফলে মাছির আক্রমণ কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ওষুধ ছিটানোর প্রয়োজন হয় না। এতে ভোক্তারাও নিরাপদ আম পান। তিনি বলেন, তাঁর উৎপাদিত আমের বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি হয়। এ জন্য স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক কম আম বিক্রি করেন।
স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে এই বাগান। হানিফ মণ্ডলের অ্যাগ্রো ফার্মে নিয়মিত সাত থেকে আটজন শ্রমিক কাজ করেন। মৌসুমভেদে কাজের পরিমাণ বাড়লে শ্রমিকের সংখ্যাও বাড়ে। বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, ব্যাগিং ও অন্যান্য কাজে স্থানীয় লোকজন যুক্ত থাকেন।
নতুন জাতের আমের ফলন, স্বাদ ও বাজার সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন হানিফ মণ্ডল। তাঁর আশা, নতুন ও দেরিতে পাকা জাতের আমের চাষ বাড়লে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি আমের মৌসুমও দীর্ঘ হবে। আর সেই সঙ্গে রাজশাহীর আম চাষে যুক্ত হবে নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত।