নৌকাটি প্রস্তুত করেছেন সিরাজুল ইসলাম (৩৪) নামের স্থানীয় এক যুবক। তিনি পেশায় ফ্রিল্যান্স রিকশা পেইন্টার। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবহার কমাতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

সিরাজুল ইসলাম থাকেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর শহরে। পড়াশোনায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। তবে ছবি আঁকার প্রতি ছোটবেলা থেকে ঝোঁক ছিল। পরে এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। ১৮ বছর ধরে তিনি রিকশা পেইন্টিং করছেন। রাজধানীর এক চিত্রকরের কাছ থেকে শিখেছেন এই কাজ। এখন শ্রীপুরের বিভিন্ন রিকশার গ্যারেজে চুক্তিভিত্তিক পেইন্টিং করে জীবন চালান সিরাজুল।

সকালে যখন সিরাজুলের সঙ্গে দেখা হলো, তখন তিনি নৌকাটি উপজেলার বরমী এলাকার বানার নদে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বিচিত্র নৌকাটি দেখতে তখন চারদিকে বিভিন্ন বয়সী মানুষের জটলা বেঁধেছে। ছবি তুলতে চাইলে নৌকা তৈরির কারিগর সিরাজুল মাথায় গামছা বেঁধে হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন নৌকার পাটাতনে।

ছবি তোলা শেষে জানালেন তাঁর ‘বোতল নৌকা’ তৈরির আদ্যোপান্ত। তিন মাসের পরিশ্রমে নৌকাটি  তৈরি করেছেন। এটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে কোমল পানীয়ের ১২০ কেজি বোতল। বিভিন্ন জায়গা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বোতল ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু বোতল স্থানীয় ভাঙারির দোকান থেকে কিনেছেন সিরাজুল।

কেন এমন উদ্যোগ, জানতে চাইলে সিরাজুল বলেন, বছর দুয়েক আগে একদিন কোমল পানীয় পান করার সময় তাঁর মাথায় প্রশ্ন এল—‘এসব বোতলের শেষ গন্তব্য কোথায়?’ পরে স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, এসব প্লাস্টিক বোতল অপচনশীল। এগুলো বিভিন্নভাবে নদী, খাল-বিলের পানি ও কৃষিজমিতে মিশে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। তখন থেকে তিনি প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার কমানোর বিষয়ে সচেতন করতে থাকেন। যেহেতু তিনি সৃজনশীল কাজের সঙ্গে জড়িত, তাই মানুষকে সচেতন করতে বিচিত্র কিছু তৈরির পরিকল্পনা করেন।

প্লাস্টিকের বোতলের পাশাপাশি এ নৌকা তৈরির জন্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়েছে বাঁশ, দড়ি, রং, কিছু স্টিলের পাত ও তিনটি চাকা। সিরাজুল বলেন, ‘আমি এই নৌকা নিয়ে নৌভ্রমণে যাব। নৌকাটি দেখতে ব্যতিক্রম হওয়ায় এটি মানুষের দৃষ্টি কাড়বে। আর এর মাধ্যমে আমি মানুষকে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দেব।’

সিরাজুলের দাবি, এ নৌকায় ১৫ জন অনায়াসে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারবেন। বোতল ব্যবহারের কারণে বাতাস কিংবা মধ্যম মাত্রার ঢেউয়ে নৌকার কোনো ক্ষতি হবে না। এটি তৈরিতে খুব বেশি খরচ হয়নি। তাই চাইলে যে কেউ বোতল কুড়িয়ে এনে এ ধরনের নৌকা তৈরি করতে পারেন।

নৌকাটি দেখতে আসা শ্রীপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, বোতল নৌকাটি দেখতে অভিনব। এতে সবুজ ও লাল রং ব্যবহার করায় দেখতে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় গণসচেতনতায় নৌকাটি বেশ সাড়া ফেলবে বলে মনে হচ্ছে।

নৌকা তৈরির কাজে সিরাজুলকে সহযোগিতা করেছেন তাঁর বন্ধু আহমদ আলী। আহমদ বলেন, সিরাজুল নৌকাটি  তৈরি করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। গতকাল বুধবার স্থানীয় একটি পুকুরে নৌকাটি ভাসানো হয়েছিল। তখন সবাই এ অভিনব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। একের পর এক লোক নৌকায় উঠে ছবি তুলেছেন।