দুই বছর পর ফিরল গুড়পুকুরের মেলা, ফিরল পুরোনো স্মৃতিও

ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলায় বসেছে নানা পণ্যের দোকান। বৃহস্পতিবার দুপুরে সাতক্ষীরার শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কেছবি: প্রথম আলো

বাবার হাত ধরে একসময় গুড়পুকুরের মেলায় আসতেন আজিজুল ইসলাম। বাবা কিনে দিতেন খাবার, খেলনা। মেলার ভিড়, সারি সারি দোকান আর মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনো তাঁর মনে সতেজ। সময়ের সঙ্গে তাঁর বয়স বেড়েছে, বদলেছে মেলার চেহারা। তবু মেলার প্রতি টানটা কমেনি। দুই বছর পর আজ বৃহস্পতিবার আবার সাতক্ষীরা শহরের শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে গুড়পুকুরের মেলা বসতেই নাতিকে নিয়ে এসেছেন ষাটোর্ধ্ব আজিজুল।

আজিজুল ইসলামের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায়। আজ দুপুরে মেলা প্রাঙ্গণে আট বছরের নাতিকে নিয়ে ঘুরছিলেন তিনি। মেলায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নাতির সঙ্গে মেলায় এসে নিজের ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। তখন মেলায় কত ভিড়, কত দোকান আর কত রকমের জিনিস থাকত। এখন মেলায় সেই জৌলুশ না থাকলেও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারছেন, এতেই ভালো লাগছে।

‘গুড়পুকুরের মেলা’ নামটি নিয়ে আছে নানা মত। তবে স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, শহরের পলাশপোল এলাকায় একটি পুকুর ছিল। পুকুরটির নাম ছিল গুড়পুকুর। বহু বছর আগে সেই পুকুরপাড়ে মনসাপূজাকে কেন্দ্র করে বসত মেলা। পরে মেলার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ‘গুড়পুকুরের মেলা’ নামে পরিচিতি পায়।

সাতক্ষীরার রইচপুর এলাকা থেকে মেলায় ঘুরতে এসেছেন তরুণ মোকাররাম বিল্লাহ। তিনি বলেন, এই মেলার অনেক গল্প বড়দের কাছে শুনেছেন। এবার বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে এসেছেন। মেলার সেই ঐতিহ্য ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

দুপুরে মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পার্কজুড়ে বসেছে শতাধিক দোকান। মিষ্টি, কাপড়, মসলা, শাড়ি, প্রসাধনসামগ্রী ও শিশুদের খেলনার দোকানের পাশাপাশি আছে কাঠের আসবাব ও দা-বঁটির দোকানও। শিশুদের বিনোদনের জন্য আছে নৌকার আদলে তৈরি নাগরদোলা।

গুড়পুকুর মেলার ফটকের সামনে ভিড়। বৃহস্পতিবার দুপুরে সাতক্ষীরার শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্ক এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

এ মেলা বসায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ের পথ খুলেছে। লেবু দিয়ে তৈরি শরবত বিক্রি করছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, প্রথম দিনেই মেলায় মানুষের ভালোই ভিড় হচ্ছে। বাকি দিনগুলোতেও এমন ভিড় থাকলে ব্যবসা ভালোই হবে।

মেলার মাঠে ঘুরতে ঘুরতে প্রবীণদের চোখে যেন বর্তমানের চেয়ে বেশি ভেসে ওঠে অতীতের মেলার স্মৃতি। পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকার প্রবীণ মো. ইদ্রিস আলী বলেন, এখন এই মেলা একটা নিয়ন্ত্রিত মেলা। অথচ আগে মেলা ছিল পুরো সাতক্ষীরা শহরজুড়ে। আগে সাতক্ষীরার পাকাপুল ও নিউমার্কেট এলাকা থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ধরে তিন-চার কিলোমিটারজুড়ে মেলা বসত। প্রাণসায়র খাল দিয়ে নৌকায় মাটির হাঁড়িপাতিলসহ বিভিন্ন পণ্য আসত। মেলা সাত দিন চললেও কাঠের খাট, পালঙ্ক, শোকেস ও আলমারির মতো আসবাবের দোকান এক মাস, কখনো তারও বেশি সময় থেকে যেত।

মেলার চেহারা বদলালেও মানুষের স্মৃতিতে এর জায়গা বদলায়নি বলে জানান মেলায় আসা দর্শনার্থী নাসিমা খাতুন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মেলায় আসতেন। তখন মেলা থেকে আখ আর ইলিশ মাছ কিনে বাড়ি ফেরেননি—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।

গুড়পুকুরের মেলার বয়স নিয়ে স্থানীয় প্রবীণদের মধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের কথা প্রচলিত। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায় মনসাপূজাকে কেন্দ্র করে মেলার সূত্রপাত, পরে তা বড় লোকজ মেলায় রূপ নেয়। মেলায় গ্রামীণ পণ্যের পাশাপাশি ইলিশ মাছ, গাছের চারা ও সুন্দরবনের গোলপাতাও বিক্রি হতো।

মুনজিতপুর এলাকার বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, পুরো জেলার মানুষ, এমনকি যশোরের মানুষও সারা বছরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র মেলা থেকে কিনতেন। মেয়েদের বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে দেওয়ার আসবাবও অনেকে এখান থেকে কিনতেন। সেই পরিবেশ এখন আর নেই।

সময়ের সঙ্গে মেলার বিস্তৃতি ও জৌলুশ অনেকটাই কমেছে বলে স্থানীয় মানুষের ধারণা। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলা চলাকালে বোমা হামলায় তিনজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর কয়েক বছর মেলা বন্ধ ছিল। পরে ছোট পরিসরে শুরু হলেও আগের সেই জৌলুশ ফেরেনি। গত দুই বছর মেলাও বসেনি। এবার শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে সীমিত পরিসরে মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

মেলায় তরুণদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। কেনাকাটার পাশাপাশি কেউ কেউ ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে ব্যস্ত ছিলেন
ছবি: প্রথম আলো

মেলার পুরোনো জৌলুশ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রশাসনিক উদ্যোগের ঘাটতিকেও দায়ী করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বোমা হামলার পর থেকে প্রশাসন ও সাতক্ষীরা পৌর কর্তৃপক্ষ মেলার দায়িত্ব আগের মতো নেয়নি। সবার মধ্যে একটা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এখন যে মেলা হচ্ছে, এর মধ্যে বাণিজ্যিক বিষয়টাই বেশি।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এ বছর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা আয়োজন করা হয়েছে। মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি মেলায় যাতে কোনো আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড না ঘটে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।