‘ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত হবে, টিনের ঘরটি পাকা করবে—কত আশা, সব শেষ হয়ে গেছে’

রাজুর বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। গতকাল দুপুরে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার কংশনগর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

সাত বছর কাতারে ছিলেন, তবে আয়-উপার্জন তেমন করতে পারেননি। তাই ভাগ্য ফেরাতে জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনার টাকায় অবৈধ পথে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। পরিবারে সচ্ছলতা ফিরবে, টিনের ঘরটি পাকা করবেন—এতটুকুই আশা ছিল তাঁর। তবে সেই আশা আর পূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন মো. রাজু (৩৮)।

রাজুর বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কংশনগর গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনের একটি পিৎজার দোকানে বন্দুকধারীর গুলিতে গত শনিবার রাতে নিহত হন তিনি। তবে পরিবার রাজুর মৃত্যুর খবর পায় পরদিন রোববার।

দেশে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন রাজু। বড় মেয়ে জান্নাতুল নাইমার জন্মের পর জীবিকার উদ্দেশ্যে কাতারে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সাত বছর ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে কাতার থেকে দেশে ফেরার পর ওই বছরের শেষের দিকে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে কংশনগর গ্রামের পাইক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা রাজুর বাড়িতে ভিড় করেছেন। ঘরের ভেতরে আহাজারি করছেন রাজুর স্ত্রী পলি আক্তার, ১২ বছরের কন্যা জান্নাতুল নাইমা ও আড়াই বছরের রাইসা আক্তার, বাবা মোহাম্মদ উল্যাহসহ পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশীদেরও।

প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন ভাই তিন বোন রয়েছেন রাজুর। ছেলেদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। দেশে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন রাজু। বড় মেয়ে জান্নাতুল নাইমার জন্মের পর জীবিকার উদ্দেশ্যে কাতারে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সাত বছর ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে কাতার থেকে দেশে ফেরার পর ওই বছরের শেষের দিকে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। সেখানে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তিনি। সর্বশেষ পিৎজার দোকানটিতে চাকরি নিয়েছিলেন।

নিহত মো. রাজু
ছবি: প্রথম আলো

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বজনদের বরাতে পরিবারের সদস্যরা জানান, শনিবার রাতে দোকানে কর্মরত ছিলেন রাজু। এ সময় এক দুর্বৃত্ত সেখানে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে রাজু ছাড়া আরও একজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘরে কথা হয় রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্যাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছেলেটা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছে। অনেক কষ্টের বিনিময়ে আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্রে) গেছে। তাকে নিয়ে আমারও অনেক আশা ছিল। ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত হবে, টিনের ঘরটি পাকা করবে—কত আশা, সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থাটুকু করে।’

আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছে রাজু। সাত বছর কাতারে থাকলেও তেমন কিছু করতে পারেনি। বাড়িতে থাকার ঘরটি এখনো ভাঙাচোরা। শেষে নিজের সহায়-সম্বল বিক্রি করে স্বপ্নপূরণের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তার মৃত্যু হলো।’