বৌদ্ধরা আদালতে সাক্ষ্য না দিলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবেন

ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। গত ১০ বছরে বৌদ্ধবিহারে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় করা ১৮ মামলার একটিরও বিচার হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসছেন না বলে মামলার ধীরগতি। অন্যদিকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, বৌদ্ধবিহারে যাঁরা হামলা করেছিলেন, তাঁদের আসামি করা হয়নি। সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে কক্সবাজার আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ও সিনিয়র আইনজীবী ফরিদুল আলমের সঙ্গে।

সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ও সিনিয়র আইনজীবী ফরিদুল আলম
ছবি : প্রথম আলো

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: ১০ বছরেও রামুতে হামলার ১৮ মামলার কোনোটির বিচার হলো না। কারণ কী?

ফরিদুল আলম: রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধবিহার ও হিন্দু মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯টি। একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে কয়েক বছর আগে। বাকি ১৮ মামলা বিচারাধীন। আমরা চেষ্টা করছি বিচার কার্যক্রম শুরু করতে। গোপনে অথবা প্রকাশ্যে সাক্ষীদের আদালতে আনার চেষ্টা চালিয়েছি। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছি। কষ্টের কথা হলো, তাঁরা সাক্ষ্য দিতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধ্বংসস্তূপের ওপর এক বছরের মাথায় নান্দনিকভাবে নতুন বিহারগুলো তৈরি করে দিয়েছেন, পুড়ে যাওয়া বসতিগুলোও তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাক্ষীরা আসামিদের মুখোমুখি হতে চান না, বৌদ্ধরা চান না সাক্ষ্য দিয়ে নতুন ঝামেলায় জড়াতে।

প্রশ্ন :

চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া রামু হামলার ১৮ মামলার সাক্ষীদের আদালতে আনার দায়িত্ব পিপি হিসেবে আপনার ওপর বর্তায়। তা না হলে বিচার কার্যক্রম আরও বিলম্বিত হতে পারে...

ফরিদুল আলম: সাক্ষীদের আদালতে আনার দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ কম চেষ্টা করেনি। তারপরও আমরা কয়েকজনকে (সাক্ষী) এনে সাক্ষ্য দেওয়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁরা কিছুতেই সাক্ষ্য দেবেন না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বলেছি, অন্তত কয়েকজন সাক্ষী যেন সাক্ষ্য দেন। এতে বিচারকাজটা এগিয়ে যাবে। কিন্তু সাক্ষ্য দিতে কেউ রাজি নয়।

প্রশ্ন :

১৮ মামলার ১৬৭ সাক্ষীর ৯০ শতাংশ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। আছেন বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষুও। তাঁরা বলছেন, হামলার ঘটনায় যাঁরা জড়িত ছিলেন, পুলিশ তাঁদের আসামি করেনি। নিরীহ লোকজনের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে তাঁরা নতুন করে বিপদে পড়তে চান না। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

ফরিদুল আলম: ঘটনার পর পুলিশ যখন মামলাগুলোর তদন্ত শুরু করে; তৎকালীন যিনি পিপি ছিলেন, তিনি ঠিকমতো দেখভাল করতে পারেননি। তিনি (পিপি) তৎপর থাকলে অন্তত কয়েকটা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হতো। পরবর্তীকালে মামলাগুলো যখন ট্রায়ালে এল, তখন কয়েকটা মামলা পুনঃতদন্তের জন্য দিতে হয়েছে। এগুলো তদন্ত হয়ে আসতে দেরি হয়। তত দিনে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত, যাঁরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তাঁরাই এখন সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না।

প্রশ্ন :

যাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে রামুতে হামলার ঘটনা, সেই উত্তম কুমার বড়ুয়া কোথায়?

ফরিদুল আলম: উত্তম বড়ুয়ার কোনো খোঁজখবর নেই। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটা অজানা। যে আইডি থেকে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেটা উত্তমের কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমার মনে হয়, ওই আইডি ভুয়া ছিল। তা ছাড়া ওই সময় আইডি যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সুবিধা তেমন ছিল না। তবে পুলিশের করা সহিংসতার মামলায় উত্তম বড়ুয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: শেষ পর্যন্ত সাক্ষীরা যদি আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসেন, সে ক্ষেত্রে মামলার ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে?

ফরিদুল আলম: অপরাধের বিচার হবে না, সেটা মানতে পারছি না। তাই সাক্ষীদের পেছনে লেগে আছি। অন্তত একটা মামলার যেন বিচার হয়। মানুষ যেন জানতে পারে, রামুতে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত যদি সাক্ষীদের আদালতে সাক্ষ্যের জন্য আনতে ব্যর্থ হই, তাহলে সব মামলার আসামিরা পার পেয়ে যাবেন। চাপা পড়ে যাবে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় করা একটি ঘটনার নেপথ্য কারণ।