দীপু মনির ভাইয়ের ‘টিপুনগরে’এবার মাছ বিক্রি নিয়ে বিতর্ক

চাঁদপুরের হাইমচরের নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচরে মেঘনা নদীর পশ্চিমে ‘টিপুনগর’ এর অবস্থানছবি : প্রথম আলো

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ভাই জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ (টিপু) ও তাঁর সহযোগীদের দখলে থাকা চাঁদপুরের হাইমচরের আলোচিত ‘টিপুনগর’ এখন আদালতের নিয়ন্ত্রণে। সেখানকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দেখভালের জন্য হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) রিসিভার নিয়োগ দিয়েছেন আদালত। এবার সেই সম্পত্তির মাছের ঘের থেকে নিয়ম না মেনে মাছ ধরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে রিসিভারের দায়িত্বে থাকা ওসি মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্প্রতি ঘেরে জাল ফেলে কয়েক লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে। এ জন্য উন্মুক্ত নিলাম বা দরপত্রের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। মাছ বিক্রির অর্থও সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।

তবে মাছ বিক্রির কথা স্বীকার করলেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ নাজমুল হাসান। তাঁর ভাষ্য, ঘেরের মাছ ধরা ও বিক্রি করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।

হাইমচরের ৪ নম্বর নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচরে মেঘনা নদীর পশ্চিমে জেগে ওঠা এই চরেই প্রায় ৪৮ দশমিক ৫২ একর জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। ২০১৯ সালে ছয়টি দলিলের মাধ্যমে এসব জমি জাওয়াদুর রহিম ও তাঁর সহযোগীদের নামে নেওয়া হয়। সেখানে মাছের ঘের, গবাদিপশুর খামার, ফল ও সবজির বাগান গড়ে তোলা হয়। জাওয়াদুর রহিমের ডাকনাম অনুসারে এলাকাটি ‘টিপুনগর’ নামে পরিচিতি পায়।

২০২২ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘চাঁদপুরে খাসজমিতে টিপুনগর’ শিরোনামে এই জমি দখলের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। তখন উপজেলা ভূমি অফিসের নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চরটিতে দিয়ারা জরিপ হয়নি। সেখানে স্থানীয় কৃষকদের নামে থাকা জমাবন্দী বা খাজনার রসিদ জমির মালিকানা নির্দেশ করে না। অথচ এমন কাগজপত্রের ভিত্তিতেই ছয়টি দলিলে মোট ৪ হাজার ৮৫২ শতাংশ বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫২ একর জমি ব্যক্তির নামে নেওয়া হয়েছিল। ছয়টি দলিলে জমির গড় মূল্য দেখানো হয়েছিল শতাংশপ্রতি মাত্র ৪৬৫ টাকা।

ওই সময় ভূমি প্রশাসনের নথিতে আরও বলা হয়েছিল, নদীতে চর জেগে ওঠার পর দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে জমির মালিকানা নির্ধারণ হওয়ার কথা। কিন্তু বাহেরচরে সে জরিপ না হওয়ায় ব্যক্তিমালিকানার সুস্পষ্ট ভিত্তি ছিল না। পরে সরকারি জমি উদ্ধারে জাওয়াদুর রহিমসহ ২৫ জনকে বিবাদী করে আদালতে মামলা করে জেলা প্রশাসন।
জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে পরে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধানে নামে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইমচর সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় ও উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দলিল তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় দুদকের চাঁদপুর কার্যালয়। দুদকের অনুসন্ধানে জাওয়াদুর রহিম ছাড়াও তৎকালীন নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সরদার, হাইমচর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী, মুনসুর আহমেদ ও আইনজীবী সাইফুদ্দিন বাবুর নাম আসে।

এই জমি নিয়ে মামলা চলার একপর্যায়ে আদালত সম্পত্তি দেখভালের জন্য হাইমচর থানার ওসিকে রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব দেন। সেই দায়িত্ব পাওয়ার পর ঘেরের মাছ বিক্রির পদ্ধতি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন
মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম ও নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নিলাম ছাড়া মাছ বিক্রি হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।
মনির সিকদার, নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান

নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনির সিকদার বলেন, আদালতের রিসিভারের দায়িত্বে থাকা সম্পত্তি থেকে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম ও নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নিলাম ছাড়া মাছ বিক্রি হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

টিপুনগরের জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানিয়েছেন হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায়। তিনি বলেন, ‘টিপুনগরের জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা রয়েছে। সরকারি খাসজমি ও মালিকানার বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার অধীনে থাকায় এ মুহূর্তে জায়গাটি নির্দিষ্ট করে কার, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা আদালতের মাধ্যমে এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পরামর্শ চেয়েছি। তখন থেকেই আদালত হাইমচর থানার ওসি রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেন।’