এসব মনগড়া ব্যাখ্যায় মন ভরে না। কারণ জানতে খুঁজে বের করা হলো এমন কাজের উদ্যোক্তাকে। তাঁর নাম রুহুল আমিন (কাজল)। একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী তিনি। এমন একজন শিল্পী কেন গফরগাঁওয়ে এসে মহাসড়কের ঢালে রোদে পুড়ে ছবি আঁকছেন! এমন প্রশ্নের উত্তর জানা যাক শিল্পীর মুখ থেকেই।

রুহুল আমিন বলেন, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা একসময় ‘ডাকাতের দেশ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। চুরি-ডাকাতির হার এখন অনেক কমে গেছে। তবে যুগ যুগ ধরে ডাকাতি, চুরিসহ মানুষে মানুষে নানা ধরনের সহিংসতার কারণে এ জনপদ এমন নেতিবাচক পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে চলাচল করা ট্রেনগুলোতে গফরগাঁওয়ে ঘটত চুরি-ডাকাতির ঘটনা। এ কারণে ট্রেনযাত্রীদের মনে একটা ভীতি ছিল অনেক বছর ধরে। গফরগাঁও নিয়ে মানুষের এমন ভীতি কাটাতে সড়কে ছবি আঁকা হচ্ছে।

রুহুল আমিনের স্বপ্ন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে গফরগাঁও উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও দেয়ালজুড়ে আঁকা হবে এমন ছবি। যাঁরা আগে গফরগাঁও আসার আগে ট্রেনের দরজা–জানালা বন্ধ করে দিতেন, তাঁরা একদিন ছবি দেখতে খুলে দেবেন ট্রেনের জানালা। গফরগাঁও শহরে ঢুকে দেখবেন, দেয়ালে দেয়ালে শিল্পের ছোঁয়া। ক্রমশ ছবির খবর ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশের মানুষের কাছে। গফরগাঁও হয়ে উঠবে দেয়ালচিত্রের শহর। নতুন নতুন প্রজন্ম জানবে, তাঁরা ছবির জনপদের মানুষ।

রুহুল আমিনের বাড়ি গফরগাঁও উপজেলার মশাখালী গ্রামে। তিনি বর্তমানে ডেনমার্কপ্রবাসী। ছবি আঁকা তাঁর পেশা। ইউরোপের নানা দেশে ছবি এঁকে বেড়ান তিনি। ১৯৯৪ সালে সুইডেনে কার্নিভ্যালে আমন্ত্রণ পেয়ে ট্র্যাফিক আর্ট (সড়কচিত্র) করে তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে রুহুল আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মৃৎশিল্প বিভাগে ভর্তি হন।

মৃৎশিল্পের ওপর পড়া শেষ করে আবার ভর্তি হন ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ে। ১৯৮৪ সালে তাঁর ‘কলোনি সিরিজ’ নামের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে। কলোনি সিরিজের ছবিগুলো মানুষের প্রশংসায় ভাসে। এরপর ১৯৮৬ সালে তাঁর আঁকা ‘সোসাইটি সিরিজ’নামে আরও একটি প্রদর্শনী হয়। এরপর তিনি চলে যান বিদেশে।

রহুল আমিন বলেন, ছোটবেলা থেকে ঢাকায় থাকলেও প্রতিবছর পরীক্ষা শেষে তিনি গফরগাঁওয়ে গ্রামে আসতেন। সেখান তিনি গ্রামের ছেলের মতো পুকুরে লাফ দিয়ে গোসল করে এবং নদীতে গরুকে গোসল করিয়ে সময় কাটাতেন। গ্রামের যাত্রাপালায় বিবেক চরিত্রের গান শুনে প্রথমে তাঁর মাথায় এ চিন্তা ঢোকে। এরপর থেকে তাঁর মনোজগতে কেবল দর্শন আর শিল্প খেলা করে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দেশে আসেন। ফেব্রুয়ারিতে নিজের আঁকা ছবির প্রদর্শনী করেন দেশে। এরপর সেসব ছবির প্রদর্শনী করেন দেশের বাইরে।

রুহুল আমিন আরও বলেন, ‘লোকজ সুন্দর’ শিরোনামে গফরগাঁওয়ে সড়কে যে ছবিগুলো আঁকা হচ্ছে, সেগুলো বাতাসে জীবন্ত হয়ে দোল খাবে। মানুষের মনে ছবিগুলো ইতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলবে, এমন স্বপ্ন নিয়েই তিনি ছবি আঁকার কাজটি করছেন। এ ছাড়া শুধু শহরের মানুষকে ঘিরেই সৃষ্টি হয় শিল্প। গ্রামের মানুষের জন্য কোনো শিল্প সৃষ্টি হয় না। প্রচলিত এ ধারণাকেও বদলে দেবে ‘লোকজ সুন্দর’ প্রকল্পটি।

আপাতত সড়কের চিত্রকর্ম শেষ করে রুহুল আমিন চলে যাবেন ডেনমার্কে। পরে আবারও এসে করা হবে দেয়ালচিত্রের কাজ। তখন মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি আঁকবেন বলে জানান তিনি। গফরগাঁও ছাড়া দেশের অন্য কোনো স্থানে এমন চিত্রকর্মের কাজ কেউ করতে চাইলে তিনি সহযোগিতা করবেন।

গফরগাঁওয়ে ছবি আঁকা কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ফাহমি গোলন্দাজ। রুহুল আমিনের মতে, ফাহমি গোলন্দাজ পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, তবে কী আঁকা হবে তা নিয়ে তিনি কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করছেন না। যে কারণে কাজটি ভালোভাবে হচ্ছে।

জ ই সুমন নামের একজন চিত্রশিল্পীসহ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষার্থীও সার্বক্ষণিকভাবে এ কাজে সহযোগিতা করছেন। এ ছাড়া গফরগাঁওয়ের চর এলাকার পাঁচ তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সড়কের পাশে ছবি আঁকার কাজে সহযোগিতা করছেন।