‘৮০ বছরের একান্নবর্তী পরিবার’ দেখে মুগ্ধ হলেন সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার
চা-বাগানের পাশঘেঁষা গ্রামটিতে অতীতে কোনো ভিনদেশি অতিথির আগমন ঘটেনি। প্রথমবার এমন এক অতিথির আগমনে পরিবারের সদস্যদের আনন্দের সীমা ছিল না। পরিবারের রীতি অনুযায়ী, উলুধ্বনি দিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাঁকে বরণ করা হয়। গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় ফুলের মালা। এ সময় আশপাশের লোকজনও ভিড় জমান। এরপর অতিথি ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটান।
ওই অতিথি হলেন সিলেটে নিযুক্ত সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস। আজ বুধবার দুপুরে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামে আট দশক ধরে বসবাসকারী একান্নবর্তী পরিবারের বাড়িতে যান তিনি। ওই পরিবারের সদস্যদের আদি বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়। সহকারী হাইকমিশনারের বাড়িও পশ্চিমবঙ্গে।
বেলা তিনটার দিকে সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস ওই বাড়িতে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে আগেই বাড়ির উঠানে ছোট প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। সেখানে কয়েকটি চেয়ার ও সামনে টেবিল রাখা হয়। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে পেছনে টানানো হয় একটি ব্যানারও। পরিচয় পর্বের শুরুতে একান্নবর্তী পরিবারের আত্মীয় স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন পাল বলেন, ১৮৮০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় ধামাই চা-বাগান স্থাপিত হয়। তখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে লোকজন এখানকার বিভিন্ন চা-বাগানে কাজে আসেন। এরপর আর তাঁদের নিজ দেশে ফেরা হয়নি। এ পরিবারের পূর্বপুরুষেরাও চা-বাগানে কাজ করতেন। পরে তাঁরা বাগান ছেড়ে এখানে জমি কিনে বাড়ি করেন। পরে তিনি অতিথির সঙ্গে পরিবারের সব সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দেন।
সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ সদস্য সোহাগী রুদ্রপাল, শোভা রুদ্রপাল বক্তব্য দেন। এ ছাড়া সিলেটের সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব রাজেশ ভাটিয়া, ধামাই চা-বাগানের উপমহাব্যবস্থাপক কাজল মাহমুদ, স্থানীয় বিএনপির নেতা এমদাদুল হক, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক দিবাকর দাস, ধামাই চা-বাগানের শ্রমিক পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি যাদব রুদ্রপাল, গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস বলেন, ‘প্রথম আলোয় এ পরিবার নিয়ে প্রতিবেদন পড়ে আবেগতাড়িত হই। পরিবারটিকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল। সেই আশা আজ পূরণ হলো। পরিবারের সদস্যরা একত্রে দীর্ঘদিন ধরে থাকছেন, এটা অনেক বড় বিষয়। এ ধরনের পরিবার ভারত বা বাংলাদেশে সচরাচর দেখা যায় না। গোটা পৃথিবীই একটি পরিবার। এই যে মিলেমিশে থাকা, এটা সম্প্রীতির বড় উদাহরণ। আপনারা (পরিবারের সদস্য) যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, সেটা দুই দেশের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। আপনাদের দেখে খুবই মুগ্ধ হলাম।’
অনুষ্ঠানে এলাকাবাসী সহকারী হাইকমিশনারকে জানান, স্থানীয় বটুলি শুল্ক স্টেশন দিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভারত ভ্রমণে ভিসা পান না। অথচ ভারতীয় নাগরিকেরা ভিসা নিয়ে যাতায়াত করতে পারেন। বটুলির বিপরীতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এলাকার অনেকের আত্মীয়স্বজন থাকেন। এলাকাবাসী বাংলাদেশিদের এ পথে ভিসা প্রদানের দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন বলে জানান সহকারী হাইকমিশনার।
পরে একান্নবর্তী পরিবারের পক্ষ থেকে অতিথিদের হাতে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। ফেরার সময় সহকারী হাইকমিশনার চা-শ্রমিকদের উন্নয়নে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘গ্রাম উন্নয়ন কার্যক্রম (গ্রাউক)’ এর কার্যালয় এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ সংস্কার প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন।
বিনন্দপুর গ্রামের একান্নবর্তী ওই পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে থাকার প্রচলন শুরু করেছিলেন চা-শ্রমিক ভীম রুদ্রপাল। তাঁর জন্মস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়। ব্রিটিশ আমলে জীবিকার তাগিদে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি এ দেশে ঠিকানা গাড়েন। স্থানীয় ধামাই বাগানে শ্রমিকের কাজ নেন। এরপর আর নিজ ভূমে ফেরা হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের আগে ভীম রুদ্রপাল বিনন্দপুরে সস্তায় কিছু জমি কেনেন। একপর্যায়ে চা-বাগান ছেড়ে ওই জমিতে বাড়িঘর তৈরি করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ভীম, তাঁর দুই ছেলে মুরারি রুদ্রপাল ও কেশব রুদ্রপাল কেউই বেঁচে নেই। মুরারি ও কেশবের ৯ ছেলে। একান্নে থাকার পুরোনো ধারাটি তাঁরা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা এখন ৫০। এ নিয়ে প্রথম আলোর আঞ্চলিক ক্রোড়পত্রে ‘৮০ বছরের একান্নবর্তী পরিবার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।