সোনালু-জারুল-কৃষ্ণচূড়ায় রঙিন রাজশাহীর সড়ক

সড়কটিতে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সোনালু ফুল। অনেকে এসে ছবি তুলছেন। রাজশাহী নগরের বারো রাস্তার মোড় এলাকায়ছবি : প্রথম আলো

রাজশাহী শহরের ব্যস্ত সড়কজুড়ে এখন প্রকৃতির এক রঙিন প্রদর্শনী। কোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জারুলের বেগুনি ছায়া, কোথাও ঝুলে থাকা সোনালুর হলুদ থোকা বাতাসে দুলে উঠছে। কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুনরঙা উপস্থিতি পুরো দৃশ্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। পথচলতি মানুষের ক্লান্ত চোখে এই ফুলের সারি এনে দিচ্ছে মুহূর্তের প্রশান্তি।

রাজশাহী নগরের আলিফ-লাম-মীম ভাটা এলাকা থেকে নাদের হাজীর মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই ধারে এখন এমনই রঙিন দৃশ্য। আরও সামনে চৌদ্দপাই বিহাস পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কজুড়ে ছড়িয়ে আছে ফুলের এই আয়োজন। কোথাও সোনালুর হলুদ, কোথাও জারুলের বেগুনি, আবার কোথাও কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা লাল উৎসব—সব মিলিয়ে পথ যেন হয়ে উঠেছে এক চলমান চোখের শান্তির বাগান।

সড়কের মাঝের বিভাজনে সারি সারি পামগাছ, রঙ্গনের ঝাড় আর কাঠগোলাপের সাদা-হলুদ ফুল পথচারীদের নজর কাড়ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ পথ দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাঁদের অনেকেই একটু থেমে মুঠোফোনে ছবি তুলছেন। কেউ কেউ পরিবার নিয়ে এসে দাঁড়াচ্ছেন কয়েক মুহূর্ত।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় সড়কটি এখন ভিন্ন রূপে সেজেছে। তবে গ্রীষ্ম এলেই যেন এটি নতুন রূপ ধারণ করে। বিশেষ করে বিকেলের আলো পড়লে সোনালুর হলুদ ফুল আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর সন্ধ্যার আগে জারুলের বেগুনি রঙে তৈরি হয় অন্য রকম আবহ। তাঁরা মনে করেন, একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানকোঠায় নয়, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশেও নির্ভর করে। রাজশাহীর এই সড়ক তারই উদাহরণ। ব্যস্ত নগরজীবনে এটি এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়, অনেকের কাছে স্বস্তির ঠিকানা।

সড়কটিতে ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া ফুল। রাজশাহী নগরের দায়রাপাক এলাকা
ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি দুপুরে সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশে ফুটপাতে ফুটে আছে সোনালু ও জারুল ফুল। সবুজ পাতার ভেতরে বিশেষ কায়দায় নিজেকে জাহির করছে সোনালু। আর সব বাধা পেরিয়ে যেন ঊর্ধ্বমুখী জারুল। সড়কের আরেক অংশে দুই পাশে ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া। রাস্তার দুই ধারে ফুটপাতে লাগানো গাছে ফুলের এমন উৎসব যে কাউকে আকৃষ্ট করে। এই ফুল শুধু দিনে নয়, রাতেও মুগ্ধতা ছড়ায়।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে সড়কটিতে পরিকল্পিতভাবে দুই পাশে ফুটপাতে প্রায় ১০ হাজার গাছ লাগানো হয়। প্রতি কিলোমিটারে আলাদা প্রজাতির ফুলগাছ রোপণ করা হয়েছে। আইল্যান্ডজুড়ে বসানো হয়েছে নানা জাতের শোভাবর্ধক বৃক্ষ। সব ঋতুতেই এখানে ফুল থাকে। সড়কটিতে বসানো হয়েছে ৫৩০টি এলইডি বাতি, ফলে রাতেও এর সৌন্দর্য ভিন্ন মাত্রা পায়। এ কারণে রাস্তা ঘিরে খাবার দোকান, খেলার টার্ফ মাঠ, অসংখ্য চায়ের দোকান গড়ে উঠেছে। রাতভর আড্ডাও চলে এখানে।

নগরের বারো রাস্তার মোড় এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফুজ্জামান ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে সড়কের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। ছেলেকে কোলে নিয়ে সোনালু ফুলের সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন। তিনি বলেন, ফুলগুলো অনেক সুন্দর। রাজশাহী শহরে রাস্তার পাশে এত সুন্দর ফুলের গাছ। মানুষজন আসে এখানে ঘুরতে। তারা ছবি তোলে।

রাস্তার একটি অংশে সোনালু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেন একদল তরুণ। তাঁদের একজন মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘এখানে মাঝেমধ্যেই আসা হয়। ফুলগুলো দেখতে অনেক সুন্দর। ছবিটবি তোলা হয়। ফেসবুকে দিই। এ সময়ে এটা অন্যতম সুন্দর সড়ক।’ জারুলগাছের ছবি তুলছিলেন মোটরসাইকেলের চালক মো. জব্বার। তাঁর বাড়ি নাটোরে। এসেছিলেন রাজশাহী শহরে। তিনি বলেন, ফেসবুকে রাস্তাটির ফুলগাছ দেখেছি। এত সুন্দর ফুল ফুটে আছে। এটা চোখেরও শান্তি। স্থানীয় বাসিন্দা রায়হান আলী বলেন, দেখতেই মন ভরে যায়। সোনালু আর জারুল কী সুন্দর করে ফুটে আছে। তবে তাঁর অভিযোগ, অনেকে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এই সময়ে ফুল ফোটায় বেচাবিক্রি বেড়েছে অনেক দোকানির। চা দোকানি মো. সেলিম বলেন, এই সময়ে দিন-রাতে অনেক মানুষ আসে। সড়কটিও সুন্দর। গাছগুলোতে ফুল ফুটেছে। অনেকে এসে চা পান করে, খাবার খায়।