দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ নিহত ১৪
দুই মেয়ের সঙ্গে মা-শাশুড়িকে হারিয়ে আবদুস সালামের স্বপ্নের ঈদ হলো শোকের
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চারদিকে যখন উৎসবের প্রস্তুতি, নতুন পোশাক কেনার ব্যস্ততা আর ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ—ঠিক তখন খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে নেমে এসেছে গভীর শোক। সেখানে এখন নেই কোনো উৎসবের রেশ; আছে শুধু কান্না, হাহাকার আর প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় বেদনা।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বাড়িটিতে ছিল বিয়ের আনন্দ। উঠানে প্যান্ডেল, অতিথিদের কোলাহল, রান্নার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে ছিল আনন্দমুখর পরিবেশ। এখন সেই উঠানে পড়ে আছে প্যান্ডেলের বাঁশ, এক পাশে স্তূপ করে রাখা ব্যবহৃত প্লাস্টিকের থালা-গ্লাস। আর বাড়ির পেছনের কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি নতুন কবর। আনন্দের জায়গা দখল করে নিয়েছে শোক।
আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম ভাই। আমার দুই মেয়ে, মা আর শাশুড়ি—সবাই মারা গেছে। আমার তো মা বলে ডাকার মতো আর কেউ নেই।আবদুস সালাম মোড়ল
গত বুধবার রাতে আবদুস সালামের বড় মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের বিয়ে হয় বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা আহাদুর রহমানের সঙ্গে। বিয়ের পরদিন নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীরা রওনা দেন বরের বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু এদিন বিকেলে বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নবদম্পতিসহ ১৪ জন।
এ দুর্ঘটনায় আবদুস সালাম হারিয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে, জামাতা, বৃদ্ধা মা ও শাশুড়িকে। ছোট ছেলে ইসমাইল ছাড়া তাঁর আর কোনো সন্তান বেঁচে নেই।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে ভেঙে পড়েছেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম ভাই। আমার দুই মেয়ে, মা আর শাশুড়ি—সবাই মারা গেছে। আমার তো মা বলে ডাকার মতো আর কেউ নেই।’ কিছুটা থেমে আবার বলেন, ‘এই ঈদটা হওয়ার কথা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঈদ। নতুন জামাই-মেয়ে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করব, এই ছিল ইচ্ছা। ভাবছিলাম, বিয়ের পর ওরা বাড়িতে এলে আর যেতে দেব না। একসঙ্গে ঈদ করব। কিন্তু এখন সব শেষ।’
কথা বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন আবদুস সালাম। জানান, প্রতি ঈদেই পরিবারের সবার জন্য নতুন কাপড় কিনতেন। ২০ রোজা থেকে কেনাকাটা শুরু করে ২৫ রোজার মধ্যেই শেষ করতেন প্রস্তুতি। এবারও সেই পরিকল্পনা ছিল, নতুন জামাতাকে সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করার ইচ্ছা ছিল। তিনি বলেন, ‘গত ঈদে মা, দুই মেয়ে, শাশুড়ি—সবাইকে নতুন কাপড় দিয়েছিলাম। সবাই মিলে কত আনন্দ করেছি। আর এবার কোনো কেনাকাটা নেই, কোনো আনন্দ নেই।’
ছোট মেয়ে লামিয়া আক্তারের কথা বলতে গিয়ে আরও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘ওর (লামিয়া) বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। তবু একটা রোজাও ভাঙেনি। রোজা রেখেই মারা গেল। তিন রোজার দিন আমার সঙ্গে বাজারে গিয়ে একটা জুতা পছন্দ করে কিনেছিল। এখন সেই জুতা আছে, কিন্তু আমার মেয়ে নেই।’
পরিবারের স্বজনেরা জানান, দুর্ঘটনার দিন সকালে সবাই রোজা রেখেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। হঠাৎ খবর আসে, গাড়িটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কে ওই মাইক্রোবাসের সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। মুহূর্তেই বিয়েবাড়ি পরিণত হয় কান্নার বাড়িতে।
দুই মেয়ের সঙ্গে মা-শাশুড়িকে হারিয়ে আবদুস সালাম এখন পাগলপ্রায়। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে ইসমাইলও সেদিন ওর বোনের সঙ্গে গাড়িতে যেতে চেয়েছিল। আমি যেতে দিইনি। বলেছিলাম, পরে নিয়ে যাব। এখন ভাবি, ও যদি যেত, তাহলে হয়তো ওকেও হারাতাম। আল্লাহ অন্তত একটা সন্তান রেখে দিয়েছেন।’
ঈদের নামাজের কথাও এখন কাঁটার মতো বিঁধছে আবদুস সালামের মনে। তিনি বলেন, ‘প্রতি ঈদে নামাজে যাওয়ার আগে মাকে সালাম করতাম, হাতে টাকা দিতাম। এখন মা নেই। ঈদের কথা মনে হলেই মনটা ভেঙে যায়।’
আবদুস সালামের স্ত্রীও এই শোক সামলাতে পারছেন না। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কয়েক দিন ধরে স্যালাইন নিতে হয়েছে। বেশির ভাগ সময় নিঃশব্দে শুয়ে থাকেন, মাঝেমধ্যে উঠে বসেন, আবার শুয়ে পড়েন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আজ আবদুস সালাম মোড়লকে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে নৌবাহিনী। সেখানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। এর আগে নৌবাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন এবং পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে কোনো আশ্বাসেই যেন সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন না আবদুস সালাম। কারণ, যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
চারদিকে যখন ঈদের আনন্দের প্রস্তুতি, তখন আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে শুধুই নিস্তব্ধতা। সাহ্রির সময়, ইফতারের সময়—প্রতিটি মুহূর্তেই ফিরে আসে প্রিয়জনদের স্মৃতি। সালাম মোড়ল বলেন, ‘দুই রাত কিছু খাইনি, না খেয়ে রোজা রাখছি। খাইতে গেলে ওদের বড্ড মনে পড়ে। আল্লাহ যেন এমন পরীক্ষা আর কাউকে না দেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’