কর্মচারী থেকে সাত দোকানের মালিক হলেন, সেই উদ্যোক্তা মারা গেলেন ডেঙ্গুতে

মহিন উদ্দিনছবি: সংগৃহীত

ভাগ্য বদলাতে চট্টগ্রাম নগরে এসেছিলেন মহিন উদ্দিন (৩২)। পরে একটি কাপড়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজেই কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। এভাবে একে একে সাতটি দোকানের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি। সেই মহিনের জীবন থামল ডেঙ্গুতে। গত বুধবার বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মহিন উদ্দিন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মুছাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তবে তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে তিনি নগরের চকবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত সোমবার তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর ওই দিনই তাঁকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে বৃহস্পতিবার সকালে সন্দ্বীপে তাঁর দাফন হয়।

গতকাল শনিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, মহিন উদ্দিনের বাড়িতে ঢুকতেই ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। বাড়ির উঠানে তাঁর স্বজনেরা এখনো ভিড় করে রয়েছেন। ঘরের ভেতর যেতেই দেখা গেল তাঁর মা, স্ত্রী ও বোনেরা বিলাপ করছেন। মহিন উদ্দিনের তিন সন্তান এখনো ছোট। তাঁর বড় ছেলের বয়স ছয় বছর। এ ছাড়া বাকি দুই মেয়ের বয়স চার ও দুই। এ দুই মেয়ে বারবার বাবার কবরে যাওয়ার বায়না ধরছে।

‘একসঙ্গেই পরিবারে সুখ আনতে চেয়েছি। সফলও হয়েছি দ্রুত। এত তাড়াতাড়ি ও আমাকে ছেড়ে যাবে, ভাবতেই পারছি না।’
রাজিয়া সুলতানা, মহিন উদ্দিনের স্ত্রী

কর্মচারী থেকে দোকানের মালিক

মহিনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চার ভাইবোনের মধ্যে মহিন ছিলেন সবার ছোট। পরিবারে তেমন সচ্ছলতা ছিল না। তাই ভাগ্যের পরিবর্তন করতে ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে যান তিনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার এক পর্যায়ে নগরের চকবাজার এলাকার একটি শপিং মলের পোশাকের দোকানে কর্মচারীর কাজ শুরু করেন।

একই শপিং মলে কাজ করতেন মহিনের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা (৩২)। সেখানেই তাঁর সঙ্গে মহিনের পরিচয় হয়। বিয়ের পর নিজেই ব্যবসা শুরু করেন মহিন। ধীরে ধীরে সচ্ছলতা আসতে থাকে। ২০২০ সালে ওই শপিং মলেই তিনি ‘স্মার্ট লেডি’ নামে মহিলাদের পোশাকের দোকান দেন। সাফল্য পাওয়ায় গত ছয় বছরে একে একে সাতটি দোকানের মালিক হয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে রাজিয়া সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসঙ্গেই পরিবারে সুখ আনতে চেয়েছি। সফলও হয়েছি দ্রুত। এত তাড়াতাড়ি ও আমাকে ছেড়ে যাবে, ভাবতেই পারছি না। অনেক সংগ্রামে আমাদের সুখের সংসার হয়েছিল। শূন্য থেকেই সব করেছি। এখন ও ছাড়া আমার আর আমাদের ছেলেমেয়েদের কী হবে, জানি না।’

মহিনের বাল্যবন্ধু ও প্রতিবেশী আশরাফ উল্লাহ চট্টগ্রামে একসময় তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। মহিন অসুস্থ হওয়ার পর তিনিই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর হাসপাতালেই মহিনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষার প্রতিবেদন আসে বুধবার দুপুরে। এতে মহিনের ডেঙ্গু পজিটিভ হয়।

মহিনের বাড়ির পথেই দেখা হলো আশরাফের সঙ্গে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল তাঁর। আশরাফ বলেন, মহিনের কথা মনে হলেই তাঁর খুব কান্না পায়। এত কাছের একজন মানুষ এভাবে চলে যাবেন, তা তিনি ভাবতে পারেননি।

মহিনের বড় ভাই আলমগীরও ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মহিন মারা যান। আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি হাসপাতালে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ভাই মারা যায়। একবার কথাও বলতে পারিনি।’