হতে হতেও সিটি করপোরেশন হয়নি ফরিদপুর, এখন ভোগান্তি নাগরিকদের

সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জমে যায় পানি। এতে চলাচলে ভোগান্তির শিকার হন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী আলহাজ বদিয়ার রহমান মোল্লা সড়কেছবি: আলীমুজ্জামান

ফরিদপুর পৌরসভার আয়তন ছিল ১৭ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার। সিটি করপোরেশনে উন্নীত করতে ২০১৮ সালে আয়তন বাড়িয়ে ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার করা হয়। এতে পৌরসভার জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৮ হাজার থেকে ৫ লাখ ৫৭ হাজারে পৌঁছায়। কিন্তু সাত বছরেও সিটি করপোরেশন না হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বরাদ্দ আগের মতোই আছে।

শহরের বাসিন্দারা বলছেন, আয়তন, জনবল বাড়ানোসহ সব শর্ত পূরণের পরও সাত বছর ধরে স্থগিত হয়ে আছে ফরিদপুর সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের কার্যক্রম। ওই সব শর্ত পূরণ করায় আয়তন ও জনসংখ্যা আগের তুলনায় বেড়ে যায় প্রায় চার গুণ। কিন্তু বাড়ানো হয়নি কোনো নাগরিক সুবিধা। পৌরসভার উন্নয়নকাজও থমকে আছে। ফলে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ফরিদপুর পৌরসভার বার্ষিক বরাদ্দ এখন ৭৮ থেকে ৮০ লাখ টাকা। পৌর কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দারা বলছেন, এই স্বল্প বরাদ্দে এত বড় বিশাল এলাকার উন্নয়নকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। দৈনন্দিন কাজের মধ্যে মশকনিধন কাজ একপ্রকার থেমে আছে। সড়কগুলোও সংস্কারের অভাবে দিনে দিনে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কিছু নর্দমার কাজ চলমান থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অল্প বৃষ্টিতে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সড়কবাতি জ্বলছে না। জমি কেনা থাকলেও টাকার অভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে পারছে না পৌরসভা। এ ছাড়া টাকার অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে পারছে না তারা।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী বলেন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফরিদপুর পৌরসভার যাবতীয় কাজ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পৌরবাসীর মৌলিক চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে পৌর কর।

সিটি করপোরশন করতে আট শর্ত পূরণ

ফরিদপুর সিটি করপোরেশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পৌরসভার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে নির্বাচন কমিশন তা স্থগিত করে। ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. আবুল ফজল মীরের চিঠির আলোকে ফরিদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া ওই বছরের ১৫ মার্চ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী আটটি শর্ত পূরণ করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে জানান।

সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার বিধিমালায় বলা আছে, সিটি করপোরেশন হতে হলে কোনো পৌরসভার জনসংখ্যা ন্যূনতম চার লাখ হতে হবে, এ কারণে সিটি করপোরেশন হতে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডকে উন্নীত করে ২৭টি ওয়ার্ড করা হয়। এখন এখানে জনসংখ্যা ৫ লাখ ৫৭ হাজার।

সড়কজুড়ে ময়লা–আবর্জনার স্তূপ। এতে এ সড়ক দিয়ে চলাচলকারীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গতকাল ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী কাঠপট্টির মোড়ে
ছবি: প্রথম আলো

পৌরসভার তথ্য বলছে, সিটি করপোরেশন হতে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে তিন হাজার হতে হয়, এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে আট হাজার। স্থানীয় আয়ের উৎস বার্ষিক পাঁচ কোটি টাকা হতে হয়, এখানে আয়ের উৎস ২০ কোটি টাকার ওপরে। শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে, ফরিদপুরে ছোট-বড় ২২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। প্রস্তাবিত এলাকায় ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধা থাকতে হবে, যা ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা যাবে—এখানে সেই সুবিধাও বিদ্যমান আছে। বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয় ১০ কোটি টাকা হতে হয়, ফরিদপুর পৌরসভার বার্ষিক আয় ৫১ কোটি টাকা। স্থানীয় জনমত অনুকূলে থাকতে হবে—সে শর্তও বিদ্যমান। আয়তন ২৫ বর্গকিলোমিটার হতে হবে, এখানে আয়তন ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার।

২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি উপসচিব মো. আবুল ফজল মীরের ওই চিঠিতে আটটি শর্ত পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সিটি করপোরেশনের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি নিয়ে কারও কোনো আপত্তি আছে কি না, এ নিয়ে জেলা প্রশাসনকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকও গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন। কিন্তু কারও পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না থাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণের সম্মতির বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে জানানো হয়।

২০১৮ সালের ১৯ মে রাষ্ট্রপতির আদেশে উপসচিব মো. আবদুর রউফ মিয়া স্বাক্ষরিত গেজেটে ফরিদপুর পৌরসভাকে ২৭টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা ও নয়টি (তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি আসন) সংরক্ষিত মহিলা আসনে পুনর্বিন্যাস করতে বলা হয়। পরে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডকে সিটি করপোরেশনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে ২৭টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা হয়। এ ছাড়া নয়টি সংরক্ষিত মহিলা আসনেও পুনর্বিন্যাস করা হয়।

আটকে গেল নিকারের সভায়

ফরিদপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ২০১৮ সালের ২ আগস্ট প্রি-নিকার সভায় অনুমোদনের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর নিকারের ১১৬তম সভায় প্রথম এজেন্ডা ছিল ‘ফরিদপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা’ বিষয়ক। সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভায় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দেন, ক) বিদ্যমান পৌরসভা এবং সম্প্রসারিত এলাকা নিয়ে ফরিদপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করা হলো, খ) এখন থেকে কেবল বিভাগীয় সদর দপ্তরে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা যাবে ও গ) ফরিদপুর বিভাগ স্থাপন সাপেক্ষে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার উল্লেখিত প্রস্তাব কার্যকর হবে।

‘বিভাগ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে কার্যকর হবে’ শর্ত জুড়ে দেওয়ার কারণে সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। তবে ‘বিভাগ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে’ কোনো পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হবে-এমন কোনো শর্ত সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার বিধিমালা ২০১০-এ নেই।

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি আলতাফ হোসেন বলেন, ‘দুর্বোধ্য এক কারণে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ফরিদপুর পৌরসভা ১৮৬৯ সালে স্থাপিত। আশা করি বর্তমান সরকার এ বিষয়টি বিবেচনা করবে।’

নাগরিক সেবা বঞ্চিত মানুষ

সিটি করপোরশন বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখন ফরিদপুর পৌরসভার বাসিন্দারা সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নাগরিক আন্দোলনের নেতারা বলছেন, ফরিদপুর একটি ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভা। প্রতিটি ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভা প্রতিবছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে যে বরাদ্দ পায়, ফরিদপুর পৌরসভাকেও একই বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ও ৫ লাখ ৫৭ হাজার জনগণের জন্য ফরিদপুর পৌরসভার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বরাদ্দ এখন ৭৮ থেকে ৮০ লাখ টাকা। সেখানে মাত্র ৪ দশমিক ৮৬ বর্গকিলোমিটার এবং ৩৭ হাজার ৮০২ জনসংখ্যাবিশিষ্ট গোয়ালন্দ পৌরসভারও বার্ষিক বরাদ্দ একই।

ফরিদপুর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঝুলে আছে। আমাদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের দাবি জানাই।’

সড়কজুড়ে গর্ত আর গর্ত। সেই গর্তে ফেলে রাখা হয়েছে ময়লা–আবর্জনা। এতে মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। গতকাল ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী আব্দুল করিম মিয়া সড়কে
ছবি: প্রথম আলো

আবারও দাবি উঠেছে

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল এক সভায় ফরিদপুর সিটি করপোরেশন গঠনের দাবি জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ। ওই সভায় মন্ত্রী পদমর্যাদায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলা নিয়ে ‘ফরিদপুরে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় ফরিদপুর অঞ্চলের সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকেরা ফরিদপুর সিটি করপোরেশন ও ফরিদপুর বিভাগ বাস্তবায়নের জন্য জোর দাবি জানান।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সভাপতি আওলাদ হোসেন বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করেছেন। আমাদের বঞ্চিত করেছেন। আমরা এই বঞ্চনার অবসান চাই।’

‘বর্তমান সরকার ন্যায্য দাবি পূরণ করবে’

‘এখন থেকে কেবল বিভাগীয় সদর দপ্তরে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা যাবে’—এমন শর্ত দিয়ে ফরিদপুর সিটি করপোরেশন গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হলেও এরই মধ্যে জেলা শহর বগুড়াকে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বগুড়া সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করতে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসককে প্রস্তাব পাঠাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বগুড়ার জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার বিভাগে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানোর পর ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২০ এপ্রিল বগুড়া সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সর্বশেষ ৭ মে নিকারের সভায় বগুড়া সিটি করপোরেশনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে ফরিদপুর সিটি করপোরেশন বাস্তবায়ন করতে হবে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশাল এলাকা ও জনগণ নিয়ে গভীর সংকটে রয়েছি আমরা। আমার প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার ফরিদপুরবাসীর এ ন্যায্য দাবি পূরণ করবে।’