গাছের সঙ্গে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় একই পরিবারের তিনজন নিহত, শোকে স্তব্ধ পুরো গ্রাম
পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে তিনটি কবর। দুটি কবর বড়। মাঝের কবরটা ছোট। কবর তিনটিতে দাফন করা হবে তিন প্রজন্মের তিনজনকে—বাবা, ছেলে এবং নাতনিকে। গাছের সঙ্গে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মরদেহ পৌঁছেছে গ্রামের বাড়িতে। একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে গোটা ফতেয়াবাদ গ্রাম যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার গাইদঘাট এলাকায় যশোর-মাগুরা আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি প্রাইভেট কার সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে প্রাইভেট কারে থাকা ছয়জনের মধ্যে একটি শিশুসহ তিনজন মারা যান। আহত হন অপর তিনজন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নিহত তিনজন হলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামের আবদুল মজিদ সরদার (৭০), তাঁর ছেলে মাহমুদ হাসান ওরফে জাকারিয়া জনি (৪৩) এবং মাহমুদ হাসানের চার বছরের মেয়ে সেহেরিশ। আহত ব্যক্তিরা হলেন আবদুল মজিদ সরদারের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম (৬০), পুত্রবধূ সাবরিনা জাহান (৩০) এবং নাতি সামিন আল মাস (১০)। আহতদের মধ্যে মনোয়ারা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গতকাল সোমবার সকালে নিজেদের প্রাইভেট কারে করে বাবা-মা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় নানাবাড়িতে বেড়াতে যান মাহমুদ হাসান। সেখান থেকে রাতে তিনি নিজেই প্রাইভেট কার চালিয়ে সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় ঘন কুয়াশা ছিল। রাত তিনটার দিকে তাঁদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার গাইদঘাট এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারান। এরপর প্রাইভেট কারটি মহাসড়কের পাশে একটি বটগাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলে আবদুল মজিদ সরদার এবং তাঁর ছেলে প্রাইভেট কারের চালক মাহমুদ হাসান মারা যান। গুরুতর আহত হন সেহেরিশ, মনোয়ারা বেগম, সাবরিনা জাহান এবং সামিন আল মাস। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাঁদের উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় সেহেরিশ।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে মনিরামপুর উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে নিহত আবদুল মজিদ সরদারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়ির সামনে রাখা হয়েছে তিনটি মরদেহ। নিহত বাবা, ভাই ও ছোট্ট ভাতিজির মরদেহের পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন আবদুল মজিদ সরদারের একমাত্র মেয়ে তন্নি (৩২)। মরদেহগুলো একনজর দেখার জন্য আবদুল মজিদের ফতেয়াবাদের গ্রামের বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন গ্রামবাসী ও স্বজনেরা। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো ফতেয়াবাদ গ্রাম। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি প্রস্তুত করা হয়েছে তিনটি কবর। স্বজনেরা জানিয়েছেন, আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে নিহতদের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা।
প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানান, আবদুল মজিদ সরদার ইটভাটা ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি মনিরামপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সাবেক পরিচালক ছিলেন। আবদুল মজিদ সরদারের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে মাহমুদ হাসান বড়। মনিরামপুর বাজারে তাঁর ইন্টারনেটের ব্যবসা রয়েছে। মেয়ে তন্নি ছোট। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তিনি ঢাকায় থাকেন।
নিহত মাহমুদ হাসানের প্রতিবেশী চাচাতো ভাই মিকাইল হোসেন বলেন, আবদুল মজিদ সরদারের দুটি বাড়ি। ফতেয়াবাদ গ্রামের দোতলা বাড়িতে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। আর মনিরামপুর বাজারের হাকোবা মোড়ে প্রধান সড়কের পূর্ব পাশের তিনতলা বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন মাহমুদ হাসান। তাঁর একমাত্র বোন ঢাকায় স্বামীর সঙ্গে থাকেন। জনির মায়ের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। গুরুতর আহত মাহমুদ হাসানের স্ত্রী এবং ছেলেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। জনির মা মনোয়ারা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। মিকাইল বলেন, ‘প্রতিবছরে একবার আবদুল মজিদ চাচা-চাচিকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শ্বশুরবাড়িতে যেতেন। অনেক বছর পর পরিবারের সবাইকে নিয়ে মামার বাড়ি গিয়েছিল জনি (মাহমুদ হাসান)। এই যাওয়াটা তাদের শেষ যাওয়া হলো।’
পরিচিতজনেরা জানান, মাহমুদ হাসান অনেক রাত করে ঘুমাতে যেতেন। রাত জাগা তাঁর পুরোনো অভ্যাস। ঈদের কারণে গত দুই দিন তাঁর আরও বেশি করে রাত জাগা পড়েছে। সেই অবস্থায় সোমবার সকালে সবাইকে নিয়ে প্রাইভেট কার চালিয়ে তিনি চুয়াডাঙ্গায় গিয়েছিলেন। সারা দিন ঘোরাঘুরি শেষে সেখানে আবার রাত জেগে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি রাত জাগার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
বারোবাজার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। চালক ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে প্রাইভেট কার চালানোর কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।