চট্টগ্রাম নগরে সড়কের ওপর এখনো চামড়ার স্তূপ, দুর্গন্ধে টেকা দায়

হাটহাজারী সড়কের আতুড়ার ডিপো থেকে আমিন জুট মিল পর্যন্ত এলাকায় খোলা আকাশের নিচে পশুর চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ ও শুকানোর কাজ চলছে। তীব্র দুর্গন্ধে পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। আজ দুপুরে আতুড়ার ডিপো এলাকায়ছবি: জুয়েল শীল

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম সড়কের ওপর লবণজাত করা হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। নগরের আতুরার ডিপো থেকে আমিন জুট মিল পর্যন্ত মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক দখল করে রাখা হয়েছে চামড়া। কিছু কিছু চামড়ার ওপর কালো পলিথিন দেওয়া হলেও বেশির ভাগ উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

পবিত্র ঈদুল আজহার তিন দিন পার হলেও এখনো সড়ক থেকে চামড়া সরানো হয়নি। আজ রোববার দুপুরেও সড়কের ওপর খোলা ও পলিথিন মোড়ানো চামড়া ছিল। অতীতেও এভাবে চামড়া রাখার ঘটনা ঘটেছিল।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া লবণজাত করার জন্য দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার অনুরোধ করলে এক দিন বাড়ানো হয়। রোববার থেকে সড়কের ওপর চামড়া রাখার সুযোগ নেই।

তবে কাঁচা চামড়ার আড়তদারেরা দাবি করেছেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। গুদামে রাখার জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর রেখেছেন। তবে এক-দুই দিনের মধ্যে সরিয়ে নেবেন।

এভাবে সড়কের ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় কাঁচা চামড়া রাখার কারণে পরিবেশ দূষিত হবে এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করেন মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এরপর তাঁদের কাছ থেকে আড়তদারেরা এসব চামড়া কিনে নেন। তা নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় নিজস্ব গুদামে লবণজাত করে রাখেন তাঁরা। পরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্যানারির মালিকদের কাছে বিক্রি করেন।

চট্টগ্রাম নগরে কাঁচা চামড়ার গুদামগুলোর অবস্থান নগরের আতুরার ডিপো এলাকায়। এখানে রয়েছে চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়। তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ। তবে শেষ পর্যন্ত সমিতির সদস্যরা ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে গরুর চামড়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০টি। ছাগলের চামড়া ৫৩ হাজার ৮০০ এবং মহিষের চামড়া ১১ হাজার ৯৫০টি। সমিতির ১১২ জন সদস্য থাকলেও চামড়া সংগ্রহ করেছেন ৪০ জন আড়তদার।

আজ দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের আতুরার ডিপো থেকে আমিন জুট মিল পর্যন্ত মূল সড়কের ওপর চামড়া স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ফুটপাত ঘেঁষে এসব চামড়া রাখা হয়। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারপাশে। দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পেতে পথচারীদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নাক ও মুখ চেপে যাতায়াত করছেন। গাড়ির যাত্রীদেরও একই অবস্থা হয়।

সড়কের ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে চামড়া। আজ বেলা ২টায় চট্টগ্রাম নগরের আমীন জুটমিল এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একটি হচ্ছে মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক। এই সড়ক দিয়ে নগরের পাশাপাশি উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার মানুষ যাতায়াত করেন। আজ সোমবার থেকে অফিস-আদালত চালু হবে, এই কারণে গ্রামের বাড়ি থেকে মানুষ নগরে ফিরতে শুরু করেছেন। গত দুই-তিন দিন মানুষের যাতায়াত কম থাকলেও এখন তা বেড়েছে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। এখন গুদামে চামড়া রাখার জায়গা হচ্ছে না। তাই সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সড়কের ওপর চামড়া রাখতে হয়েছে। সোমবারের মধ্যে সব চামড়া সরিয়ে নেওয়া হবে। এখন যদি সরিয়ে নেন তাহলে চামড়াগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, সড়কে এখন ২০ থেকে ৩০ হাজার চামড়া রয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী রোববার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, আড়তদার সমিতির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সড়কের ওপর চামড়া রাখার জন্য দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। এরপরও রাস্তার চামড়া রাখায় শনিবার রাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গিয়েছিলেন। পরে রাতের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় নেন। এখনো যদি চামড়া রেখে দেন, তাহলে আবার অভিযান পরিচালনা করা হবে।

জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ও চিকিৎসক সুশান্ত বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে উন্মুক্ত অবস্থায় চামড়াগুলো রাখার কারণে প্রাথমিক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। চর্ম রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। উৎকট দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে রাসায়নিক বিষক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত হবে। এতে মানুষের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। আবার বাতাসে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের অভাব হবে। শ্বাসকষ্টজাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।