২১ বছর ধরে বনজঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করে সংসার চালান জাফর

নিজের সংগ্রহ করা মধু দেখাচ্ছেন মৌয়াল আবু জাফর মোল্লাহ। সম্প্রতি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

ভাঙাচোরা একটি বাইসাইকেলের সামনে পাতিল, পেছনে খড়ের গোছা। এই সম্বল নিয়ে গ্রামের পথঘাটে ছুটে চলেন আবু জাফর মোল্লাহ (৫৪)। কখনো রাজশাহীর বাগমারা ও দুর্গাপুর, আবার কখনো নওগাঁর বিভিন্ন এলাকা কিংবা বনজঙ্গলে তাঁর দেখা মেলে। প্রায় ২১ বছর ধরে এভাবেই মৌচাকের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। পেশায় তিনি একজন মৌয়াল।

আবু জাফর মোল্লাহর বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌরসভার দারগা মারিয়া গ্রামে। শুরুতে একই গ্রামের মৌয়াল আবদুস সাত্তারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। সেখান থেকে কৌশল রপ্ত করে নিজেই এ পেশায় নামেন।

আবু জাফর বলেন, তিনি বিশেষ কায়দায় সরাসরি মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। এরপর সেই মধু ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। বাক্সে পালন করা মৌমাছির মধুর চেয়ে সরাসরি মৌচাক থেকে সংগ্রহ করা মধুর প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বেশি। এ কারণেই তাঁর মধুর আলাদা কদর আছে। তাঁর ভাষ্য, ‘২০০১ সাল থাইকা একটা সাইকেল লিইয়্যা মৌচাকের সন্ধানে বনজঙ্গলে ঘুইরা বেড়াই।’

মৌচাকের সন্ধানে আবু জাফরকে যেতে হয় জঙ্গল ও নির্জন এলাকায়। সেখানে খড়ের গোছায় আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। ভরা মৌসুমে মাসে প্রায় ৭৫ হাজার টাকার মধু সংগ্রহ করতে পারেন বলে জানান তিনি। তবে বর্ষা মৌসুমে কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে বা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে চলতে হয়।

শর্ষে, আম, লিচু, তিল, বরইসহ বিভিন্ন বুনো ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে চাকে জমা করে। এ পেশা থেকেই আবু জাফরের সংসারে এখন স্বাচ্ছন্দ্য। আগে মাটির ঘরে থাকলেও বর্তমানে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন। ছেলেমেয়েদের বিয়েও দিয়েছেন।

আবু জাফরের স্ত্রী শরিফা বিবি (৪০) বলেন, ‘স্বামী মধু বিক্রি কইরা সংসার চালায়। দিনমজুরি না কইরা এই কামে আমরা ভালোই আছি।’

আবু জাফর জানান, এক সহকর্মীকে নিয়ে তিনি বাগমারা ছাড়াও দুর্গাপুর, পুঠিয়া, মান্দা, আত্রাই ও রানীনগর এলাকায় মৌচাকের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। কখনো নিজে খুঁজে পান, আবার অনেক সময় লোকজন খবর দেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করলে একটি অংশ তাদের দিতে হয়।

সহকারী জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে আবু জাফর
ছবি: প্রথম আলো

সহকারী জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘জাফর আমার ওস্তাদ। তার কাছ থাইকা চাক ভাঙা শিখছি। ওস্তাদ যা দেয়, তা দিয়াই আমার সংসার চলে।’

দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকার কারণে মৌমাছির প্রতি আলাদা মায়া তৈরি হয়েছে বলে জানান আবু জাফর ও জয়নাল। মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছি যাতে পুড়ে বা মারা না যায়, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক থাকেন। মৌমাছির মেজাজ বুঝতে পারেন বলেও দাবি জাফরের।

নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে জাফর বলেন, ২০১৪ সালে ভবানীগঞ্জ এলাকার এক আমগাছের মৌচাক ভাঙতে গিয়ে মৌমাছির আক্রমণের শিকার হন। প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেদিন রাতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এলাকায় তাঁর মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর পেশা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত পারেননি।গোপালপুর আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রায় ১১ বছর ধরে জাফরের কাছ থেকে মধু কিনি। ভেজাল না থাকায় দাম বেশি হলেও কিনে থাকি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করাও একটি পেশা। তবে এ সময় মৌচাক ও মৌমাছির ক্ষতি যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি মধু প্রক্রিয়াজাত করার সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।