কুষ্টিয়ায় বিদেশি সবজি ক্যাপসিকাম চাষে অধিক মুনাফায় খুশি চাষিরা, আগ্রহী হচ্ছেন অন্যরাও

মালচিং–পদ্ধতিতে ১০ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন কৃষকেরা। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের মাঠপাড়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

উচ্চফলনশীল বিদেশি সবজি ক্যাপসিকাম চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের নানা বয়সী অন্তত ৩০ কৃষক। চলতি মৌসুমে তাঁরা ইউনিয়নের নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের মাঠপাড়া এলাকায় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে এই সবজি চাষ করেছেন। গাছে ভালো ফল আসায় ইতিমধ্যে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন তাঁরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে ১৫০-২০০ টাকা দরে প্রায় দুই হাজার কেজি ক্যাপসিকাম প্রায় তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ক্যাপসিকাম চাষ থেকে চলতি মৌসুমে খরচ বাদ দিয়ে ১৪ লক্ষাধিক টাকা মুনাফা সম্ভব হবে। স্বল্প সময়ে ক্যাপসিকাম চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় বিদেশি এই সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এলাকার অন্য কৃষকেরাও।

চাঁদপুর ইউনিয়নে জংগলী আধুনিক কৃষি সমবায় সমিতি নামে কৃষকদের একটি সংগঠন রয়েছে। সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন (খসরু) ২০২৪ সালে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে দুই বিঘা (৩৩ শতকে বিঘা) জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেন। সে বছর ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি প্রায় ৪ লাখ টাকা মুনাফা পান। এতে ক্যাপসিকাম চাষে আগ্রহ দেখান সমিতির অন্য সদস্যরাও। তাঁদের মধ্যে ৩০ জন নানা বয়সী শিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত কৃষক যশোর অঞ্চলের ‘টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতা’য় নিয়ামতবাড়িয়া মাঠপাড়া এলাকায় ১০ বিঘা জমিতে নিরাপদ উচ্চফলনশীল সবজি ‘ইন্দ্রা গোল্ড’ জাতের ক্যাপসিকাম চাষ করেন। ১২০ দিন জীবনকালের এ সবজির চারা রোপণের ৬০ দিনের মাথায় ফল দেওয়া শুরু হয়েছে।

কুমারখালী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একদল কৃষক উচ্চমূল্যের সবজি ক্যাপসিকাম চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। কৃষি অফিসের পরামর্শ, উপকরণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকেরা প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা খরচ করে ২৪ লাখ টাকার ক্যাপসিকাম বিক্রির স্বপ্ন বুনছেন।

খেত থেকে ফসল তুলে সেখানেই বিক্রি করা হচ্ছে। গত শুক্রবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের মাঠপাড়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

কৃষক লিখন আলী জানান, জমির ইজারা, চারা, সার, পরিচর্চাসহ ১০ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষে তাঁদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। গত সাত দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ক্যাপসিকাম তুলেছেন। প্রতি কেজি ক্যাপসিকাম পাইকারি ১৫০-২০০ টাকা করে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। জমিতে যে পরিমাণ ক্যাপসিকাম হচ্ছে, তাতে উৎপাদন আগামী দুই মাসে প্রায় ১৪ হাজার কেজির প্রত্যাশা করছেন। এতে অনায়াসেই ২১–২২ লাখ টাকার ক্যাপসিকাম বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

আরও পড়ুন

গত শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা সড়ক ঘেঁষে নিয়ামতবাড়িয়া মাঠপাড়া এলাকা। সেখানে চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে মালচিং–পদ্ধতিতে ক্যাপসিকাম চাষ করা হয়েছে। সবুজ গাছে ঝুলছে ফল। চার-পাঁচজন করে কৃষক দল বেঁধে গাছ থেকে ফল তুলছেন, কোনো দলের সদস্যরা সেগুলো পরিষ্কার করছেন। আরেক দল কৃষক সেগুলো আধুনিক যন্ত্রে পরিমাপ করে প্যাকেট করছেন।

ষাটোর্ধ কৃষক মুন্সী মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম বারের মতো ক্যাপসিকাম চাষ করা হয়েছে। গাছে প্রচুর ফল দেখে খুব ভালো লাগছে। বাজারে ভালো দাম থাকায় ব্যাপক লাভের আশা করছি।’ তিনি জানান, ধান, পাট, পেঁয়াজসহ অন্যান্য চাষাবাদের পাশাপাশি এ বছর ৩০ জন মিলে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন।

ভালো ফলন হওয়ায় প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে কৃষকেরা ক্যাপসিকাম চাষ দেখতে আসেন। গত শুক্রবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের মাঠপাড়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

সাত দিন ধরে ক্যাপসিকাম তুলে কুষ্টিয়া, রাজশাহী, পাবনা, খুলনা ও ঢাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান, কৃষক গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ভালো ফলন হওয়ায় প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে কৃষকেরা দেখতে আসেন। তাঁদের পরামর্শও দিচ্ছেন তাঁরা। সমিতির অন্যতম সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, আগামী দুই মাস ধরে ফল পাওয়া যাবে। এরপর জমিতে আধুনিক জাতের পেঁপের চারা রোপণ করা হবে।

আরও পড়ুন

ক্যাপসিকাম চাষের সফলতার খবরে দেখতে এসেছিলেন নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের কৃষক রাজ্জাক বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘এলাকায় প্রথমবারের মতো এ চাষ হয়েছে। ভালো ফলন ও লাভজনক হওয়ায় আগামী বছর এক বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করব।’ বিদেশি সবজি চাষের খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মৃত্তিকাপাড়া এলাকাল কৃষক আতিয়ার রহমান। তিনি বলেন, গাছে রোগবালাই নেই, মালচিং–পদ্ধতিতে বিষমুক্ত চাষাবাদ হয়েছে। দেখেশুনে খুব ভালো লাগছে। আগামীতে তিন বিঘা জমিতে এর চাষ করবেন।

জংগলী আধুনিক কৃষি সমবায় সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন বলেন, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে গত বছর দুই বিঘা জমিতে প্রথম ক্যাপসিকাম চাষ করেছিলেন। এতে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ৪ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। তাঁর দেখাদেখি সমিতির অন্য সদস্যদের আগ্রহ বাড়ে এ চাষে। সে জন্য এ বছর ৩০ জন মিলে ১০ বিঘা জমিতে এটি চাষ করেছেন। আগামী বছর ২৫ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, উচ্চমূল্যের সবজি ও ফসল চাষাবাদে যশোর টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের পরামর্শ, উপকরণ প্রদান ও প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলছে।

আরও পড়ুন