অদম্য মেধাবী-২০২৬–২
অভাবের সংসারে বড় স্বপ্ন তাদের
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর চার পরিবারেই আনন্দ। সন্তানের জিপিএ-৫ পাওয়ায় মুখে হাসি ফুটেছে মা-বাবার। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে আছে দুশ্চিন্তাও। অভাবের সংসারে এত দিন কষ্ট করে পড়াশোনা করানো গেলেও এখন কলেজের ভর্তি, বই, যাতায়াতসহ খরচ কীভাবে জোগানো হবে, তা জানেন না তাঁরা। তবু দারিদ্র্যকে জয় করে জিপিএ-৫ পাওয়া এই চার শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে নেই। সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ সফটওয়্যার প্রকৌশলী।
মাছ ধরে, টিউশনি করে পড়েছে হাজিরা
বর্ষা এলেই বাড়িঘর ডুবে যায়। বছরের সাত-আট মাস পানিতে তলিয়ে থাকে যশোরের কেশবপুর উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের মাঠঘাট। তখন কাজ না থাকায় প্রতিটি পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। এমন পরিবারের মেয়ে হাজিরা আক্তার মিতু মায়ের সঙ্গে বিলে মাছ ধরেছে, নিজে টিউশনি করেছে। সেই সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫।
হাজিরা আক্তার স্থানীয় গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব চার কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটে বিদ্যালয়ে যেত।
বিজ্ঞানে পড়ার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হয়েছে উল্লেখ করে হাজিরা আক্তার বলে, তার ইচ্ছা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়া। তবে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়ার খরচ কীভাবে জোগাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার।
হাজিরাদের পাঁচ শতক জমি ছাড়া আর কিছু নেই। বাবা হোসেন আলী শীতকালে ইটভাটায় কাজ করেন, অন্য সময় দিনমজুরি করেন। সংসারের খরচ চালাতে মা শরিফা বেগমকে বিলে মাছ ধরতে হয়। ছুটির দিনে ও বিদ্যালয় থেকে ফিরে মাকে মাছ ধরায় সহযোগিতা করত হাজিরা। বাড়ির পাশের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে নিজেরও কিছু আয় করত।
শরিফা বেগম বলেন, ‘অনেক দিন খাবার জোটেনি। প্রায়ই মেয়েকে না খেয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে। আমরা নিজেরা না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছি। এত অভাবের মধ্যেও মেয়েকে পড়িয়েছি।’
হাজিরার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত বসু বলেন, ‘মেয়েটির পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। বিদ্যালয় থেকে তার পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়নি, সহায়ক বইপত্রও দেওয়া হয়েছে। তার একাগ্রতার জোরেই ভালো ফল করেছে।’
দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না মুসফিকুরের
ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আগ্রহ মুসফিকুর রহমানের। স্বপ্ন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। কিন্তু ভালো ফল করেও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না-অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার খাটুরিয়া ধনীপাড়া গ্রামে মুসফিকুরদের বাড়ি। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাতায়াত করেছে সে। বাবা মো. আবদুল কাদের বিভিন্ন হাটবাজারে গরু বেচাকেনার কাজ করেন। ছয় শতাংশের ভিটেটুকুই পরিবারের সম্বল।
মুসফিকুর বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হতে চাই। কিন্তু আমার পরিবারের কলেজে পড়ানোর মতো অবস্থা নেই। এখন আমার পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়েছে।’
মা মনিরা আক্তার পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছোট মেয়ে কামিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তিনি বলেন, ‘ছেলে আরও পড়তে চায়। কিন্তু ওর বাবার সামর্থ্য নেই।’
মুসফিকুরের বাবা আবদুল কাদের বলেন, ‘আমি নিজে লেখাপড়া জানি না। ছেলে কলেজে ভর্তি হতে চায়। কিন্তু আমার কোনো সামর্থ্য নেই।’
খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, মুসফিকুরকে বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। সহযোগিতা পেলে সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কোচিং–প্রাইভেট পায়নি নাদিয়া
মা গৃহিণী, বাবা দিনমজুর। সংসারে যেখানে তিন বেলা খাবার জোটানোই কষ্ট, সেখানে মেয়ের পড়ার খরচ জোগানো যেন বিলাসিতা। তবু দারিদ্র্য থামাতে পারেনি নাদিয়া আফরিনকে। নেই কোচিং, নেই প্রাইভেট শিক্ষক। সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ছুট লক্ষ্মীপুর গ্রামের মেয়ে নাদিয়া। বাবা কেরামত আলীর ১০ শতক জমি থাকলেও তা চাষ করে তিন বেলার খাবার জোটে না। বাবা অন্যের জমিতে দিন মজুরি করে অতিকষ্টে সংসার চালান।
কেরামত আলী বলেন, ‘পড়ালেখায় মেয়েটার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। পেটে ভাত না থাকলেও বই ছাড়া থাকতে পারত না। আমি যতটুকু পেরেছি করেছি। ধারদেনা করেও চেষ্টা করেছি মেয়েটার পড়ালেখা চালিয়ে যেতে।’
মেয়ে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হতে চায় উল্লেখ করে কেরামত আলী আরও বলেন, ‘আমার যা অবস্থা, মেয়েটার সামনে পড়াশোনাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। কলেজে ভর্তি, বই, যাতায়াত সবকিছুতেই এখন অর্থসংকট।’
ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল নাদিয়া। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নাদিয়া সত্যি অনুকরণীয়। কঠিন বাস্তবতা থেকেও এমন ফলাফল বিরল। সে যদি সহযোগিতা পায়, ভবিষ্যতে সে অনেক দূরে যেতে পাড়বে।
সাফল্য ধরে রাখতে চায় মরিয়ম
পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট মরিয়ম খাতুন। বড় চার বোনের কেউ সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত, কেউ নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু মরিয়ম সেই পথে হাঁটতে চায় না। পড়াশোনা করে দরিদ্র মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চায় সে। বাবা-মাও তাকে উৎসাহ দিতে থাকেন।
নিজের সংকল্পে অটুট মরিয়ম খাতুন এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভার ধানগড়া পশ্চিম পাড়ার রিকশাচালক মো. নুরুল আমিনের মেয়ে।
রায়গঞ্জ উপজেলা সদর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল মরিয়ম। সে বলে, ‘উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।’
মেয়ের এই পথচলায় পাশে থাকতে চান মা মোছা. গোলাপজান। তিনি বলেন, ‘আগের চার মেয়েকে নানা কারণে পড়ালেখা করাতে পারিনি। ছোট মেয়েটা শুরু থেকেই পড়ালেখায় ভালো। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাকে পড়ালেখা শেষ করার জন্য চেষ্টা করা হবে।’
বাবা নুরুল আমিনেরও একই ইচ্ছা। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় তার দারুণ ঝোঁক। আমার যত কষ্টই হোক মেয়েটাকে পড়ালেখা করাতে চাই। একটু সহযোগিতা পেলে মেয়েটাকে পড়ালেখা করাতে সুবিধা হতো।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি, নীলফামারী, তারাগঞ্জ, রংপুর, কেশবপুর, যশোর ও রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ]