ঠাকুরগাঁওয়ে সুপারফুড কিনোয়া চাষ, বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তা কৃষকদের

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে প্রথমবারের মতো কিনোয়া আবাদ শুরু হয়েছে। কিনোয়াগাছ দেখাচ্ছেন এক কৃষক। সম্প্রতি উপজেলার পাতিলাভাসা এলাকায়ছবি : প্রথম আলো

গ্রামের কাঁচা রাস্তাটি এঁকেবেঁকে মিশে গেছে দূরদিগন্তে। দুই ধারে সাদা সাদা পেঁয়াজ ফুল। কোথাও কোথাও সবুজ ভুট্টাখেত। সেসবের মাঝে দুলছে সাদা আর খয়েরি শস্যের শীষ। অপরিচিত ফসলের খেত দেখে থমকে দাঁড়ালেন কৃষক গোবিন্দ বর্মন। কৌতূহল নিয়ে নেমে পড়লেন খেতে, নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন গাছগুলো।

এ সময় এগিয়ে এলেন আবদুল বাতেন। তিনি জানালেন, এগুলো কিনোয়াগাছ। কিনোয়া মূলত দক্ষিণ আমেরিকার ফসল। দানাদার-জাতীয় এই শস্যকে বলা হয় সুপারফুড।

আবদুল বাতেন ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাতিলাভাসা এলাকার বাসিন্দা। এবার তিনিসহ ওই এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক কিনোয়া চাষ শুরু করেছেন।

বালিয়াডাঙ্গীর চাড়োল এলাকা পেঁয়াজবীজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। তবে ঝুঁকির কারণে অনেক কৃষক পেঁয়াজবীজ উৎপাদন থেকে সরে আসছেন। নতুন ফসল কিনোয়া চাষের ব্যাপারে জানতে পেরে আগ্রহী হন আবদুল বাতেনসহ কয়েকজন।
বাতেন জানালেন, বগুড়ার এক দন্ত চিকিৎসকের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে প্রথমবারের মতো দুই বিঘা জমিতে কিনোয়া চাষ করেছেন। অন্য ফসল চাষের তুলনায় খরচও কম। এই ফসল আবাদে কেবল দুবার সেচ দিতে হয়েছে। আর নিড়ানি দিতে হয়েছে একবার। দুই বিঘা জমিতে কিনোয়া চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ৮-১০ মণ ফসল পাবেন বলে তাঁর আশা। একটি বীজ কোম্পানি ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বীজ কিনে নিতে চেয়েছেন। তবে প্রতি কেজি হাজার টাকা পেলেই তিনি খুশি।

আবদুল বাতেন বললেন, পেঁয়াজবীজ উৎপাদনের তুলনায় কিনোয়া চাষে ঝুঁকি ও খরচ কম; লাভ বেশি।

চাড়োল গ্রামের কৃষক দবিজুল ইসলাম দীর্ঘদিন পেঁয়াজ, লালশাক ও ডাঁটাবীজ উৎপাদন করেন। এবার তিনি এসব ফসলের পাশাপাশি এক একর জমিতে কিনোয়া আবাদ করেছেন। তবে বাজার নিয়ে কিছুটা চিন্তিত তিনি। দবিজুল বললেন, ‘কোম্পানির লোকজন কিনতে চাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত তারাঁ কিনবেন কি না, সেটি নিয়ে চিন্তিত। স্থানীয় কৃষকেরাও বীজ কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফসল বিক্রি করতে না পারলেও প্রয়োজনে নিজেরা খাবেন।’

বাতেনের খেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন কৃষক তপন রায়। নতুন ফসল দেখে কিনোয়াগাছগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন তিনি। ফসলটির বিষয়ে তাঁকে জানানোর পর তিনি তপন বললেন, ‘কিনোয়া সম্পর্কে আমার আগে কোনো ধারণা ছিল না। জানলাম, এটা লাভজনক ফসল। লাভ হলে আমিও আবাদ শুরু করব।’

সম্প্রতি কিনোয়াখেত পরিদর্শন করেছেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গুলজার রহমানসহ কৃষি কর্মকর্তারা। গুলজার রহমান বলেন, ‘উপজেলায় এবারই প্রথম ২১ বিঘা জমিতে কিনোয়া চাষ হচ্ছে। শীত মৌসুমে শর্ষের আবাদের সময় এটির চাষ শুরু হয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি এ ফসল চাষ করে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে মাঝামাঝি সময় ফলন ঘরে তোলা যায়। শর্ষের মতো একই পদ্ধতিতে ফসল কাটা ও মাড়াই করা যায়। কিনোয়ার গাছ শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এই সুপার ফুড আবাদ ছড়িয়ে দিতে আমরা কৃষকের পাশে আছি।’

গুলজার রহমান জানান, কিনোয়া সুপারফুড হিসেবে পরিচিত। এতে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ রয়েছে, যা সাধারণত সবজিতে পাওয়া যায় না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কিনোয়া আদর্শ খাবার।

সুপারফুড কিনোয়ার চাহিদা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। এটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎস, যাতে ৯ ধরনের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আছে। আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ই ও ফাইবারের চমৎকার উৎস এই কিনোয়া।

বিভিন্ন তথ্যকোষ ঘেঁটে জানা যায়, সুপারফুড কিনোয়ার চাহিদা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। এটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎস, যাতে ৯ ধরনের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আছে। বিশেষত লাইসিন নামের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আর কোনো উদ্ভিজ্জ আমিষ খাদ্য থেকে সেভাবে পাওয়া যায় না। আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ই ও ফাইবারের চমৎকার উৎস এই কিনোয়া।

কিনোয়া পাতা ও বীজ দেখতে শাকের মতো হলেও এই ফসলে আছে উচ্চমাত্রার হজমযোগ্য প্রোটিন। ধান বা সবজি চাষের চেয়ে এটি লাভজনক। কিনোয়াতে অ্যামিনো অ্যাসিড এবং লাইসিন থাকে, যা স্বাস্থ্যকর টিস্যু বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি খুবই উপকারী। কিনোয়া আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ই, পটাশিয়াম ও ফাইবারের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। রান্নার পর দানাগুলো আকারে চার গুণ হয়ে যায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় এবারই প্রথম ২১ বিঘা জমিতে কিনোয়া চাষ হচ্ছে
ছবি : প্রথম আলো

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) আলমগীর কবির বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে নতুন ফসল কিনোয়া। জেলার কৃষকেরা পরীক্ষামূলক কিনোয়ার চাষাবাদ শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে এই ফসলের চাষাবাদ বাড়বে। কৃষকদের ফসল বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারলে এটির আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।