কাজ করতে চান বাবলু মিয়া, শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায়
ময়মনসিংহ শহরের ছোট বাজারে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে যাচ্ছিলেন তিনি। দেখলে বোঝা যায়, তাঁর বাঁ হাত অচল, ডান হাতেও জোর নেই। ভিক্ষা চাইছেন। কেউ ১০ টাকা দেন, কেউ ২০ টাকা, কেউ ৫০ টাকা।
দিনটি ছিল ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বললে তিনি জানালেন, তাঁর নাম বাবলু মিয়া। বললেন, ‘আমাকে দেখলে যার যেমন সামর্থ্য, তেমনই দেয়। এভাবেই দিন চলে।’
বাবলু মিয়ার বয়স ৪১ বছর। বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার দেওখোলা ইউনিয়নের কুকরাইল গ্রামে। প্রায় ১৫ বছর ধরে ভিক্ষা করছেন।
মা-বাবার বড় ছেলে বাবলু মিয়া। সাড়ে তিন বছর বয়সে জ্বর হয়, তারপর টাইফয়েড। এরপর শরীর অবশ হয়ে যায়। পরিবার অনেক চিকিৎসা করিয়েছে, কিন্তু তিনি আর স্বাভাবিক হননি। এই শরীর নিয়েই ১৯৯৮ সালে বাড়ির সামনে একটি মুদিদোকান দিয়েছিলেন, তখন বয়স ১৩ বছরের মতো। প্রায় ৯ বছর দোকান চালিয়েছেন। ২০০৬ সালে বিয়ে, তারপর সন্তান, খরচও বাড়ল। গ্রামের দোকানের সামান্য বেচাকেনায় আর কুলাত না, একপর্যায়ে দোকান ছেড়ে দিতে হয়।
সপ্তাহে তিন দিন পথে
বাবার রেখে যাওয়া সাড়ে তিন শতক জমিতে ঘর তুলে থাকেন স্ত্রী বেদেনা আক্তার আর সন্তানদের নিয়ে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে পঞ্চম শ্রেণির পর অভাবের কারণে আর পড়তে পারেনি। বয়স ১৪ বছর। বাড়িতে থাকে। ছোট মেয়ে মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, ছোট ছেলের বয়স সাড়ে তিন বছর।
শরীর সায় দেয় না বলে সপ্তাহে তিন দিন বের হন বাবলু মিয়া। রোববার, বুধবার আর বৃহস্পতিবার। বাকি দিনগুলো বিশ্রাম। সকালে স্ত্রীর রান্না খেয়ে নয়টার দিকে অটোরিকশায় চড়ে আসেন শহরের ফুলবাড়িয়া পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে হেঁটে সানকিপাড়া, পুলিশ লাইনস, কাচিঝুলি, গাঙ্গিনার পাড়ের দোকানে দোকানে ঘোরেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরলে কখনো দেড় হাজার টাকার মতো পান, অন্য দিনগুলোয় সাত-আট শ টাকা। এই টাকাতেই চলে চাল, ডাল, মাছ, তরকারি আর ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ।
আমি তো কাজ করতে চাই। শুধু এমন একটা সুযোগ দরকার, যেখানে আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।’বাবলু মিয়া
কখনো কখনো পাঙাশ মাছ
২০০৫ সাল থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পান বাবলু মিয়া। শুরুতে পেতেন মাসে ২০০ টাকা। পরে ভাতা কিছুটা বাড়ে। তিন মাস অন্তর এই ভাতা পান। সেপ্টেম্বরে পেয়েছেন ৩ হাজার টাকা। ভাতার টাকা হাতে এলে ছেলেমেয়েদের প্রিয় পাঙাশ মাছ কেনেন, সঙ্গে ডিম, দুধ, কখনো গরুর মাংসও। বাবলু মিয়া বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারলে মনে হয়, অনেক দিন পর যেন একটু স্বস্তি পেলাম।’
বাড়ির কাছের দেওখোলা বাজারে একটি ছোট মুদিদোকান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন বাবলু মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি তো কাজ করতে চাই। শুধু এমন একটা সুযোগ দরকার, যেখানে আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।’
মোস্তাফিজুর রহমান: নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, ময়মনসিংহ