দুর্ঘটনায় নিহত চারজনই ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি

দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরে কৃষিশ্রমিকদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি। আজ সকালে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের ভাইগর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

গ্রামের মেঠো পথে দল বেঁধে ছুটছেন কয়েকজন। কেউ কেউ আক্ষেপের সুরে বলে উঠলেন—একসঙ্গে চারজন মানুষ মারা গেল। কাজের সন্ধানে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না তাঁদের। একই গ্রামের চারজনের এমন মৃত্যু আগে কখনো দেখেননি তাঁরা। প্রিয়জন হারিয়ে চার পরিবারে চলছে শোক; স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।

আজ মঙ্গলবার সকালে এ দৃশ্য দেখা যায় দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের ভাইগর গ্রামে।

এর আগে গতকাল সোমবার রাত সোয়া তিনটার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে সাতজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনই বিরামপুর উপজেলার ভাইগর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁরা সবাই কৃষিশ্রমিক ছিলেন।

নিহত চারজন হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মজির উদ্দিনের ছেলে আবু হোসেন (৪২), ছইফ উদ্দিনের ছেলে বিষু মিয়া (৪৫), পলাশ হোসেনের ছেলে সুমন বাবু (২২) এবং রফিতুল্লাহ মণ্ডলের ছেলে আবদুর রশিদ (৬৫)। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া নিহত অন্য তিনজন হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিপুর গ্রামের আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০) ও আবু সালেক (৪৫)।

আজ সকালে ভাইগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে নিজ নিজ বাড়ি। প্রতিবেশীরা পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিহত ব্যক্তিদের সন্তানেরা কেউ বারান্দায়, কেউ উঠানে বসে নীরবে কাঁদছেন। একই দিনে গ্রামের চারজনের মৃত্যুর খবরে আশপাশের নারী-পুরুষ ও শিশুরা ভিড় করছেন বাড়িগুলোতে।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাইগর গ্রামের ফসলি জমিতে এখন বোরো ধান। মাঠে তেমন কাজ না থাকায় অনেক কৃষিশ্রমিকেরা অলস সময় পার করছিলেন। বাড়তি আয় ও জীবিকার তাগিদে ওই চারজন প্রায়ই আশপাশের এলাকায় কাজের সন্ধানে যেতেন। গতকাল তাঁরা কুমিল্লায় ধান কাটার কাজ করতে রওনা দেন।

আজ সকালে আবু হোসেনের মুঠোফোনে কল দিয়ে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন স্ত্রী শিরিন আক্তার। তিনি বলেন, তাঁর স্বামীই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। এখন দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে চলবেন জানেন না।

আরও পড়ুন

বিষু মিয়ার বড় ছেলে রাফিয়াতুল্লাহ (১৫) স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রাফিয়াতুল্লাহ বলে, ‘গতকাল সকালে বাড়ি থেকে বাবা বের হওয়ার সময় আমাকে বলেছিল, ভালোভাবে লেখাপড়া করবি, বাবা। মা ও বোনদের দেখিয়ে রাখিস। আমাদের রেখে বাবা আজ একেবারেই চলে গেল।’

দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রিয়াজ উদ্দিন বলেন, দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সাতজন নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।