ঐতিহ্যের টুকরা দিয়ে গড়া এক শহর

খুলনা নগরের রয়েল মোড়ে চিংড়ির ভাস্কর্যছবি: সাদ্দাম হোসেন

খুলনা নামে আজ যে শহর পরিচিত, সেটি একসময় ছিল আর দশটা গ্রামের মতোই। সেই গ্রাম ছিল বর্তমান রূপসা উপজেলার রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে ও আঠারবাকীর দক্ষিণ পাড়ে। সময়ের প্রবাহে শহর সরে আসে ভৈরব নদের দক্ষিণ পাড়ে। এটিই আজকের খুলনা শহর।

১৮৪২ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বিভাগের প্রথম মহকুমা ও মহকুমা সদর হিসেবে খুলনা শহরের ভিত্তি স্থাপিত হয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন, বাণিজ্যিক বিস্তার আর মানুষের জীবন-জীবিকার টানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা খুলনা শহরের শিকড় ছড়িয়ে আছে পাড়ায় পাড়ায়—নামের ভেতর, বসতির ভেতর, মানুষের পরিচয়ের ভেতর।

দুই নদীর তীরঘেঁষা লম্বাকৃতির ছোট সেই শহর এখন আয়তনে অনেকটাই বিস্তৃত। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ভবন। মহকুমা সদর প্রতিষ্ঠাকালে মির্জাপুর মাঠসংলগ্ন এলাকায়—বর্তমানে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের আশপাশে—কিছু পুরোনো বসতি ও সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রশাসনিক সদর গড়ে ওঠার পর মির্জাপুর মাঠের দক্ষিণ দিকের টুটপাড়া, বেনেখামার ও আশপাশের কয়েকটি পুরোনো গ্রামকে ঘিরেই মূলত খুলনা শহরের বিস্তার শুরু হয়। তখনই তৈরি হতে থাকে নাম, পরিচয় আর পাড়ার সীমানা।

২০২১ সালে প্রকাশিত উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির সাময়িক পত্রিকা কথকতায় লেখক ও অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির লিখেছেন, শহর হিসেবে খুলনার বেড়ে ওঠা কোনো অভিনব ঘটনা নয়। মহকুমা হওয়ার পর প্রশাসন ও ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রয়োজনে এখানে লোকবসতি বাড়তে থাকে। অবকাঠামো বিস্তৃত ও উন্নত হওয়ার সমান্তরালে নানা পেশা ও জীবিকার মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। যেখানে এখন জেলা পরিষদ ভবন, সেখান থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণে টুটপাড়ার উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল খোলা মাঠ, উলুখাগড়ায় আচ্ছাদিত বনভূমি আর কিছু বিচ্ছিন্ন কাঁচাবাড়ি।

পদবি আর পেশায় গড়া পাড়া

খুলনার বসতি–ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আবুল কালাম সামসুদ্দিনের শহর খুলনার আদি-পর্ব গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, জেলা সদর দপ্তর মির্জাপুর মাঠের এক কোণে নির্ধারিত ছিল। সদরের দক্ষিণ, দক্ষিণ–পশ্চিম ও পশ্চিমে দুই মাইলের মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলো তখন ঘনবসতিপূর্ণ ছিল না। মির্জাপুর মাঠের আশপাশে জায়গার সংকুলান না হলে আগত মানুষ আশপাশের পতিত ও বসতভিটা জমি কিনে নিজেদের বসতি গড়ে তোলেন। এ সময়েই খুলনায় গড়ে ওঠে এক বিশেষ প্রবণতা-সম্প্রদায় ও পদবিভিত্তিক বসতি।

আজকের মূল শহরের পাড়াগুলোর নাম একত্র করলে পাওয়া যায়—টুটপাড়া, মিয়াপাড়া, করপাড়া, সরকারপাড়া, বাইতিপাড়া, পরামানিকপাড়া, রায়পাড়া, বেনেপাড়া, বসুপাড়া, বকশিপাড়া, রক্ষিতপাড়া, পৈপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, ফারাজীপাড়া, শেখপাড়া, মৌলভীপাড়া, মুন্সীপাড়া, মুসলমানপাড়া, মোল্লাপাড়া, কালিবাড়ীপাড়া—এ রকম নানা পাড়া। এ যেন পাড়ার এক জীবন্ত মানচিত্র।

গ্রন্থটিতে উল্লেখ আছে, ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে বা তার আগেও অন্যান্য শহরে পেশাভিত্তিক কিছু বসতির পরিচয় থাকলেও আধুনিক খুলনার মতো এত বেশি পদবি ও পেশাভিত্তিক পাড়ার নজির বিরল। বিস্তীর্ণ মির্জাপুর মাঠ, টুটপাড়া ও বেনেখামার—এই তিন গ্রামের মধ্যেই এসব পাড়ার বিকাশ ঘটেছিল।

ভৈরব নদের পাড়ে গড়ে ওঠেছে খুলনার বড়বাজার।বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চঘাট এলাকায়
ছবি : প্রথম আলো

হিন্দু সম্প্রদায়ের সরকার ও করেরা টুটপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। রায় পদবির ব্রাহ্মণরা পূর্ব বেনেখামারে (বানিয়াখামার), তাঁদের পশ্চিমে রক্ষিতেরা, আর বেনেখামারের পশ্চিমে পৈরা ও তাঁদের পাশে দক্ষিণে বসু উপাধিধারী কায়স্থরা নিজেদের বসতির সীমানা গড়ে তোলেন। রেললাইন বসানোর সময় উচ্ছেদ হওয়া কুণ্ডু ও কর্মকার সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার দোলখোলা মোড়ের আশপাশে নতুন বসতি স্থাপন করে—যেখান থেকে কুণ্ডুপাড়া ও কর্মকারপাড়ার পরিচয় তৈরি হয়।

বেনেখামারের উত্তরাংশে পূর্ব–পশ্চিমে এক সরল রেখায় গন্ধ বণিক, কংস বণিক ও শঙ্খ বণিক সম্প্রদায়ের বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমান ইকবালনগরের বড় অংশ নিয়ে মাঝিপাড়ার মুসলমানদের কাছ থেকে জমি কিনে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুতে ডুমুরিয়ার ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণেরা গড়ে তোলেন বৃহৎ বাগানবাড়ি।

তখনকার নতুন জেলা শহরের বসতি আজকের মতো ঘন ছিল না। জমির মূল্য ছিল তুলনামূলক কম, আর বসতির ধরন ছিল ভিন্ন। এক একটি পরিবার পুকুর, বাগান, খোলা জায়গাসহ বসতি গড়ে তুলত। এর ফলেই নবাগতদের পদবি, সম্প্রদায় বা পেশার ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক নাম ছড়িয়ে পড়ে।

বড় বড় বাড়িগুলোও পরিচিত হয়ে ওঠে পরিবারের পদবিতে-টুটপাড়ার ফকির বাড়ি, বেনেখামারের কুণ্ডু বাড়ি বা কর্মকার বাড়ির মতো নামগুলো সেভাবেই শহরের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়।

বিস্তারের সঙ্গে বদলেছে মানচিত্র

শহরের দক্ষিণে টুটপাড়া ও বেনেখামারের উত্তরাংশেই বসতির বিস্তার ঘটে সবচেয়ে বেশি। বেনেখামারের উত্তরাংশের মুসলমান অধিবাসীরা কিছুটা দক্ষিণে সরে গিয়ে যে অংশে সংঘবদ্ধ হন, সেটিই পরিচিত হয় মুসলমানপাড়া নামে। টুটপাড়ার পশ্চিমাংশে মুসলমানদের একত্র বসবাস এবং অন্য স্থান থেকে আগতদের কারণে ওই এলাকার নাম হয় মিয়াপাড়া।

বেনেখামারের উত্তর–পূর্ব কোণে স্থানীয় মুসলমানদের সঙ্গে কিছু শিক্ষিত পরিবারের বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় মৌলভীপাড়া। একইভাবে জেলা সদরের ঠিক পুব–দক্ষিণ কোণের আবাসিক এলাকায় চাকরিজীবী ও পেশাজীবী মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের কারণে এলাকার মানুষ নিজেরাই নাম রাখেন মুন্সীপাড়া। একদল পেশাজীবী সুন্দরবন থেকে শামুক এনে চুন তৈরি করতেন (বাইতি নামে পরিচিত)। মির্জাপুর মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে তাঁরা বসতি স্থাপন করায় নাম হয় বাইতিপাড়া।

এ ছাড়া বেনেখামারের মিস্ত্রিপাড়া, মাঝিপাড়া, পরামানিকপাড়া ও মধ্যপাড়ার মতো নামগুলোও আসে পেশা ও অবস্থানের ভিত্তিতে। শহরের পরিকল্পনার সময় আবাসিক এলাকার মধ্যাংশ পরিচিত হয় মধ্যপাড়া নামে-সাউথ সেন্ট্রাল রোড ও দীনবন্ধু ঘোষ (হাজী মহসিন রোড)–এর সংযোগস্থল ঘিরে।

লেখক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, যেখানেই কোনো শহর বা বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে, সেখানেই আসে বহিরাগত, ধনী ও সংগতিপন্ন মানুষ। খুলনাও তার ব্যতিক্রম নয়। সময়ের সঙ্গে খুলনা বড় একটি নগর এলাকায় রূপ নিয়েছে। তবে যে অংশকে আজ মূল শহর বলা হয়, সেখানে একসময় জনবসতি ছিল খুবই কম। এখানে বেশি পাড়া বিস্তৃত হয়েছে। শহরের খালিশপুর এলাকা পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে আশপাশের গ্রাম ও পাড়াগুলোকে নিয়ে শিল্পাঞ্চল ও শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে দৌলতপুর অঞ্চল তখন ছিল খুলনা সদরের তুলনায় বেশি ঘনবসতিপূর্ণ ও পাট বাণিজ্যকেন্দ্র।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভাস্কর্য ‘অদম্য বাংলা’
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

পাড়ার নামেই সংরক্ষিত শহরের স্মৃতি

এইভাবেই খুলনা শহরের বিস্তার ঘটেছে পাড়ায় পাড়ায়। প্রশাসনিক সদর গড়ে ওঠার পর দক্ষিণ দিকের টুটপাড়া, বেনেখামারসহ কয়েকটি পুরোনো গ্রামকে কেন্দ্র করে যে শহরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। বসতির সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নাম, পরিচয় ও সামাজিক মানচিত্র।

খুলনা তাই শুধু ইট–পাথরের নগর নয়। এখানে শহরের ইতিহাস কেবল দলিল বা নথিতে নয়—লিখে রাখা আছে পাড়ার নামে, মানুষের মুখে মুখে চলে আসা পরিচয়ে, আর বসতির স্মৃতিতে। এটি পুকুর–বাগানঘেরা এক সময়ের বসতি থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা শহর—যার প্রতিটি পাড়া এক একটি ইতিহাসের টুকরা। পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে থাকা সেই ইতিহাসই খুলনাকে দিয়েছে তার স্বতন্ত্র নগরচরিত্র।