কিশোরগঞ্জে অষ্টগ্রাম
ভাঙছে ‘অলওয়েদার সড়ক’, দায় চাপাতে ঠেলাঠেলি
এক সপ্তাহে অন্তত এক কিলোমিটার সড়ক ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে নোয়াগাঁও এবং উসমানপুর নামে দুটি গ্রাম।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নে ৯ বছর আগে নদী ঘেঁষে নির্মাণ করা হয় ‘অলওয়েদার সড়ক’। কয়েক বছর ধরেই একটু একটু করে ভাঙনে কয়েক শ একর জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। আর এখন ভাঙছে ‘অলওয়েদার সড়ক’। এই ভাঙনের দায় চাপানো নিয়ে সরকারি দুটি দপ্তরের মধ্যে চলছে ঠেলাঠেলি।
এলাকাবাসী জানান, এক সপ্তাহে অন্তত এক কিলোমিটার সড়ক ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে নোয়াগাঁও এবং উসমানপুর নামে দুটি গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি দিয়ে মানুষের এখন আর স্বাভাবিক যাতায়াত নেই। অথচ সড়কটি, বিশেষ করে নোয়াগাঁও এবং উসমানপুর গ্রামের মানুষের উপজেলা সদর ও জেলা শহরের যাওয়ার একমাত্র পথ। এমনকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নবাসীকেও কিশোরগঞ্জ যেতে সড়কটি ব্যবহার করতে হয়।
সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখতে ১৪ মে সকালে ভাঙন এলাকায় যান কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। ওই সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভাঙনের যে আকার ধারণ করছে, এতে এই গ্রাম থাকবে না। ভাঙনরোধে এরই মধ্যে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। ঈদের আগে কিংবা পরে ভাঙনরোধে স্থায়ী উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হবে।’
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, চোখের সামনে নদীতে একটু একটু করে ফসলি জমি ও সড়ক বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রতিকার চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জমি ও সড়ক রক্ষায় সরকারের এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনোটি এখন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি; বরং ভাঙনের দায় নিয়ে পাউবো ও এলজিইডির মধ্যে ঠেলাঠেলি চলছে।
এক–দুই বস্তা জিও ব্যাগ ফালাইয়া ভাঙন ঠেকানো যাইব না। ভাঙন ঠেকাইতে হইলে সরকারের সব পক্ষ এক হইয়া কাজ করতে হইব।আব্বাস উদ্দিন, নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা
এলজিইডির উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের বাঙ্গালপাড়া-নোয়াগাঁও অলওয়েদার সড়ক নির্মাণ করা হয়। সড়ক লাগোয়া নদীটিকে স্থানীয় লোকজন মেঘনা নদী কিংবা মেঘনার শাখানদী বলেন। তবে দাপ্তরিকভাবে নদীটির নাম ধলেশ্বরী। সড়কটির দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৬ ফুট।
অষ্টগ্রাম হাওর উপজেলা হওয়ায় গ্রীষ্মে শুষ্ক এবং বর্ষায় সর্বত্র পানি থাকে। এমন বাস্তবতায় সড়কটি উচ্চতায় কোথাও ১৫ ফুট, কোথাও ২০ ফুট। এই বছর ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজ শুরু হলেও সড়কটি নদীভাঙনের মধ্যে পড়ে। সড়কটির শেষ প্রান্তে নির্মাণ হচ্ছে ১৭৭ কোটি ব্যয়ে ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু। এই সেতু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরসহ আশপাশের আরও কিছু গ্রামের মানুষকে ঢাকার সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে দেবে। সেতুটির মূল সড়ক হলো এই অলওয়েদার সড়ক।
নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান। পেশায় তিনি কৃষক। স্থানীয় বাজারে তাঁর একটি দোকান আছে। এবারে ভাঙনে তাঁর ৪৫ শতক জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। আনিসুর রহমান বলেন, ‘ভাঙন এবারেই প্রথম নয়, দুই বছর আগ থেকে ভাঙন শুরু হয়। আমাদের গ্রামের মানুষ দুই বছরে অন্তত ৩০০ একর জমি হারিয়েছে। প্রতিকার পেতে প্রতিবারই পাউবো ও এলজিইডির কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানানো হয়। এবারও হয়েছে। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনে না।
উল্টো দুটি দপ্তর একে অপরকে দোষারোপ করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। এবারও একই অবস্থা। আর এ কারণেই ভাঙন না থেমে এখন সড়ক পর্যন্ত এসে ঠেকেছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভাঙনের কবলে পড়ে নোয়াগাঁও গ্রামের মফিজ উদ্দিন, তৈয়ব আলী, মাইন উদ্দিন ও আনসর আলী চার দিন আগে গৃহহারা হয়েছেন। তাঁরা গ্রাম ছেড়ে বর্তমানে অন্য স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। গ্রামটির বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিন। তিনি এবার এক বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। ফলন পুরোপুরি ঘরে তোলার আগেই পুরো জমি ভাঙনের কবলে পড়ে। ভাঙনে এখন তিনি নিজেই জমি চেনেন না।
আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘এক–দুই বস্তা জিও ব্যাগ ফালাইয়া ভাঙন ঠেকানো যাইব না। ভাঙন ঠেকাইতে হইলে সরকারের সব পক্ষ এক হইয়া কাজ করতে হইব। একজন অন্যজনরে দোষ দিয়া ভাঙন ঠেকানো যাইব না।’
এবারের ভাঙনে জমি হারানো নোয়াগাঁও গ্রামের ছবির মিয়া, আশিস জামান, ইনু মিয়া, তাহের মিয়ার ভাষ্য একই।
এ বিষয়ে কথা হয় কিশোরগঞ্জ জেলার কার্যালয়ের পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমত, সড়কটি নদীঘেঁষা। নদী লাগোয়া সড়ক করতে হলে আরও কোনো অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন আছে কি না, তা পাউবোকে এলজিইডির লিখিতভাবে জানানো উচিত, কিন্তু দপ্তরটি তা করেনি। এককথায়, এ ধরনের সড়ক নির্মাণ করতে হলে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করে করতে হয়। এই সড়কে তা করা হয়নি। এ জন্যই ভাঙছে। এখন জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা হচ্ছে।’
পাউবোর অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, কয়েক বছর ধরে ভাঙছে। অথচ পাউবো জানে না, বিষয়টি ঠিক নয়। কয়েক দিনের মধ্যে নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে ভাঙন ঠেকানোর কাজ শুরু হবে।