‘হঠাৎ বিস্ফোরণ, দেখি চার-পাঁচজন ছোটাছুটি করছেন’
‘সাহ্রির জন্য উঠেছিলাম। পাশের ফ্ল্যাটে হঠাৎ বিস্ফোরণ, বের হয়ে দেখি আগুনে দগ্ধ চার-পাঁচজন ছোটাছুটি করছেন। গায়ের কাপড়ও ঝলসে গেছে তাঁদের। একজনের পরনের কাপড়ে তখনো দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। আমি দৌড়ে ওই বাসায় গিয়ে একটা শিশুকে নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি তার গায়ে পানি ঢেলে দিই। এ ছাড়া দুজনকে হাসপাতালে দিয়ে এসেছি। ঘরের চারদিকে এখন ভাঙা জিনিসপত্র, ভয়াবহ অবস্থা।’
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে বিস্ফোরণে ৯ জন দগ্ধ হওয়ার ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন। আজ সোমবার ভোরে হালিশহরের এইচ ব্লকের হালিমা মঞ্জিল নামের যে ভবনটিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, তিনি ওই ভবনেরই বাসিন্দা। বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন ভবনটিতে গিয়ে কথা হয় জসিম উদ্দিনের সঙ্গে।
কোনো কারণে চুলা থেকে হয়তো গ্যাস লিক হয়েছিল; যে কারণে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। সেই জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন
পাঁচ বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করছেন জসিম উদ্দিন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হচ্ছিলাম। আমার ছেলেও ওয়াশরুমে ছিল। আমার স্ত্রী আর মেয়ে তখন রান্নাঘরে। বিস্ফোরণে আমার বাসার সামনের দরজা ভেঙে যায়। রুমের গ্লাস ভেঙে রাস্তায় ছিটকে পড়েছে।’
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভোর সাড়ে চারটার দিকে ছয়তলা ভবনটির তৃতীয় তলার একটি বাসায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর ওই ঘরে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টার পর তাঁরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দগ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা।
দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন সাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), উম্মে আইমন (৯), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
দগ্ধ ব্যক্তিদের কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান মো. মকবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। দগ্ধ ব্যক্তিদের স্বজন পরিচয়ে তিনি বলেন, ওই বাসায় মূলত দুই ভাইয়ের পরিবার থাকে। তবে সম্প্রতি বিদেশ থেকে তাঁদের আরেক ভাই দেশে এসে চিকিৎসার জন্য বাসাটিতে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনটি পরিবারের সদস্যরাই বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়েছেন।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ওই বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয় না। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। কোনো কারণে চুলা থেকে হয়তো গ্যাস লিক হয়েছিল; যে কারণে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। সেই জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন।
দগ্ধদের নেওয়া হয়েছে ঢাকায়
বিস্ফোরণে দগ্ধ ৯ জনকেই ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত প্রথম আলোকে বলেন, আহত ব্যক্তিদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের সবাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালির শতভাগ পুড়ে গেছে। মো. শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ পুড়েছে। মো. সুমন ও মো. শাওনের পুড়েছে ৪৫ শতাংশ। তিন শিশু—মো. আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ পুড়লে সেটিকে আশঙ্কাজনক ধরা হয়। সে হিসাবে দগ্ধ ৯ জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা জানান, দগ্ধ ব্যক্তিদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের সবাইকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ পুড়লে সেটিকে আশঙ্কাজনক ধরা হয়। সে হিসাবে দগ্ধ ৯ জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।
লন্ডভন্ড হয়েছে পুরো ঘর
সরেজমিন হালিমা মঞ্জিলে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের তৃতীয় তলার চারটি ফ্ল্যাটের প্রতিটির দরজা ভাঙা। বিস্ফোরণ ঘটা ঘরটির ভেতরের আসবাব থেকে শুরু ঘরের দেয়াল—সবই পুড়েছে। রান্নাঘরে প্রবেশের পথেই দেখা গেল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রান্নার সামগ্রী। সামনে কক্ষে একটি আইপিএসের ব্যাটারি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশের ফ্ল্যাটটির আসবাবও বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
আহত সাখাওয়াত হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার মনসুর আলী ও ভবনের সাবেক বাসিন্দা মনসুর আলীর সঙ্গে সরেজমিন কথা হয়। তিনি দাবি করেন, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের ওভার ভোল্টেজও বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। মনসুর আলী বলেন, ‘এক বছর হয়েছে আমি এখান থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছি। এই ভবনে আগেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গ্যাস বিস্ফোরণের কথা বললে হবে না। এই ভবনে ওভার ভোল্টেজ আছে।’
হালিশহর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে আমরাও শুনেছি। তবে সেখানে আইপিএসের একটি ব্যাটারি দেখা গেছে। বাকি বিষয় ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করে বলতে পারবে।’