স্বপ্নার ঘরে বসে কথা হলো স্বপ্নার মা লিপি বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবারের বিজয়ের মতো এত আনন্দ আগে ছিল না। এবার কী যে আনন্দ পাইছি! তা কেমন করিয়া বোঝাও। এত মানুষ আইসেছে। কত কথা কওয়া লাগতোছে। কত মানুষ মিষ্টি ধরি অসিল। ফুল ছিটাইল। আজ সকালের ঘুম ভাঙছে মানুষের ডাকাডাকিতে।’

ছোটবেলায় স্বপ্নার খেলা শুরুর সেই স্মৃতির কথা মনে করিয়ে মা লিপি বেগম বলেন, ‘তখন ছাওয়াটা (স্বপ্না) গ্রামের এই স্কুলোত তৃতীয় শ্রেণিত পড়ে। একদিন স্কুল থাকি আসি কইল মা, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নারী ফুটবল খেলায় স্কুল থাকি মোর নাম দিছে। সেই থাকি শুরু হইল। পরে তার খেলা নিয়া গ্রামোত কতজনে কত কথা কইছে। টিটকারি করছে। কিন্তু স্বপ্না খেলা ছাড়ে নাই। হামরাও মানুষের বাজে কথাত কান দেই নাই। সেই স্বপ্নার দল এবার নারী সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হইছে। অভাব-কষ্ট ছিল। সেই কষ্ট দূর করছে স্বপ্না। স্বপ্নার টাকায় পাকা বাড়ি হইছে। স্বপ্নার দুই বোনের বাড়িও পাকা করি দিছে স্বপ্না।’

default-image

নিভৃত এই গ্রামে মেয়েদের জন্য হয়েছে সদ্যপুস্করিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাব। সেটা স্থানীয় লোকজনের গড়ে তোলা। গ্রামের খেটে খাওয়া কৃষকেরা নিজেরা অর্থ দিয়ে গড়ে তুলেছেন এই ফুটবল ক্লাব। এখন এই গ্রামকে মেয়েদের ফুটবলের গ্রাম হিসেবে সবাই চেনেন। গ্রামের মেয়েরা এখন খেলছেন ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে।

রুনা আক্তার নামের আরেক নারী ফুটবল খেলোয়াড় দেশ-বিদেশে ফুটবল খেলেছেন। তাঁরও সুনাম ছড়িয়ে আছে এই গ্রামে। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমিও খেলেছি দেশ–বিদেশে। এখন এই গ্রামে বিনা মূল্যে নারীদের ফুটবল প্রশিক্ষণে কাজ করব। আরও বেশি খেলোয়াড় তৈরি যেন হয়, এ জন্য আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে আমার।’  

default-image

স্বপ্নাসহ গ্রামের মেয়েদের ছোটবেলা থেকে ফুটবল প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন কোচ মিলন মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক প্রতিকূল অবস্থায় এই গ্রামে মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছি। তারাই আমাদের রংপুরের মুখ উজ্জ্বল করে তুলেছে। তবে এতে গ্রামের সাধারণ মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের ফুটবলে সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে আরও অনেক দূরে যেতে চাই আমরা।’ তিনি আরও বলেন, শুরুটা করেছিলেন গ্রামের পালিচড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্ট চালু হলে এই স্কুল থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি দল। সেই দল রংপুর বিভাগে তো চ্যাম্পিয়ন হয়েছেই, জাতীয় পর্যায়ে গিয়েও চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হয়েছে কয়েক বার। ২০১১ সাল থেকে শুরু। সেই থেকে গ্রামের কিশোরীরা এখন নিয়মিত ফুটবল খেলে।

কোচ মিলন মিয়া বলেন, ২০১৬ সালে দেশের বাইরে তাজিকিস্তানে এএফসি-অনূর্ধ্ব ১৪ ফুটবল প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ দল ভারতকে ৯-০ গোলে হারিয়ে শিরোপাজয়ী হয়। এই জয়ী দলে এ গ্রামের তিনজন খেলেছেন। এর আগেও দেশের বাইরে নেপালে খেলেছেন সিরাত জাহান স্বপ্না। মৌসুমী আক্তার খেলেছেন পাকিস্তানে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন