খুলনায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, ‘কারণ’ জানিয়ে পাশে সাঁটানো হয় পোস্টার

খুলনা নগরের যশোর রোডে রেলস্টেশনের দেয়ালে আঁকা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির মুখ কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

খুলনা নগরের যশোর রোডে রেলস্টেশনের দেয়ালে আঁকা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির মুখ কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আজ শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি স্থানীয় লোকজনের নজরে আসে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মীরা। তবে কারা প্রতিকৃতিটি বিকৃত করেছে, তা এখনো জানা যায়নি।

এর আগে গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দিতে গিয়ে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। আটক অন্যরা হলেন মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) ও মারজিয়া খন্দকার (২৭)। এ ঘটনায় করা মামলায় তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস খুলনায়, তাঁর শ্বশুরবাড়িও এ জেলায়। খুলনায় তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া খুলনাবাসীর জন্য লজ্জার বিষয়।
অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির, শিক্ষাবিদ

সরেজমিন দেখা যায়, খুলনা নগরের যশোর রোডের পাশে রেলস্টেশনের দেয়ালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাটশিল্প, সুন্দরবনের গ্রাফিতির পাশাপাশি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির মুখ কালিতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির দুই পাশে দুটি পোস্টার লাগানো রয়েছে। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা’ শিরোনামের পোস্টার দুটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য লেখা হয়েছে। পোস্টারে রবীন্দ্রনাথের ‘শিবাজি উৎসব’ কবিতা উল্লেখের পাশাপাশি তাঁর একটি ছবিও দেওয়া হয়েছে। পোস্টারে লেখা রয়েছে, ‘তিতুমীরের বাংলায় মুসলিম ও পূর্ব বাংলা বিদ্বেষী রঠার ঠাঁই নাই/ ভারত বন্দনার ঠাঁই নাই।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর উপলক্ষে নগরের বিভিন্ন স্থানে সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে এসব দেয়ালচিত্র আঁকিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। দেয়ালচিত্রগুলোতে স্থান পেয়েছেন দেশবরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। এগুলো নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেয়ালচিত্রগুলো নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মীরা
ছবি: প্রথম আলো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। ফেসবুকে ওমর ফারুক নামের একজন লিখেছেন, ‘স্বাধীন দেশে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ জেসমিন আক্তার নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘কালি লেপন করে যারা, তারা রবীন্দ্রনাথ কী, তা জানে না।’

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে খুলনায় বেড়াতে আসা মানুষকে পরিচিত করতেই গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালগুলোতে গ্রাফিতি ও প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এসব দেয়ালচিত্র আমাদের শিশু-কিশোরদের মুক্তচিন্তার বিকাশে ভূমিকা রাখবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে যারা কালি লেপন করেছে, তারা নিজেদের সংকীর্ণ মনন ও অসুস্থতার পরিচয় দিয়েছে।’

খুলনা সিটির প্রশাসক নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ওখানে আমরা আবার ভালো করে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি আঁকব।’

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কারা এ কাজ করেছে, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা এ কাজ করেছে, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাদের জানাশোনা সীমিত অথবা ভুল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা চিন্তা করা যায় না।’ তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস খুলনায়, তাঁর শ্বশুরবাড়িও এ জেলায়। খুলনায় তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া খুলনাবাসীর জন্য লজ্জার বিষয়।’

আরও পড়ুন