দেড় মাস আগে দেশে আসা ওমানপ্রবাসী যুবক মো. জাবেদ হোসেনের (৩০) আগামী সপ্তাহে কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল। নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামের এই যুবক এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন। এর মধ্যেই হঠাৎ গত রোববার গভীর রাতে বাড়িতে এসে জাবেদকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর বাড়ি থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের দাবিও করে পুলিশ।
জাবেদের গ্রেপ্তারে হতভম্ভ তাঁর পরিবারের সদস্যরা। জাবেদ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্যও দিতে পারেননি এলাকার জনপ্রতিনিধি। স্বজনদের দাবি, জাবেদকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে জাবেদের বাড়িতে পুলিশ আসে। পুলিশ জানায়, জাবেদের ঘর তল্লাশি করে একটি পাইপগান, একটি কার্তুজ, দুটি চাপাতি (দেশি অস্ত্র) উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রাতের আঁধারে এই অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, জাবেদ কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
গ্রেপ্তার জাবেদ বিষ্ণুপুর গ্রামের মো. সিরাজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওমানে ব্যবসা করছেন। জাবেদের স্ত্রী ফারহানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, গত রোববার বিকেলে বাড়িতে কাজ করার সময় তাঁর স্বামীর পা কেটে যায়। তিনি স্বামীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন সন্ধ্যার পর। এসে দেখেন ঘরের দরজা খোলা। ঘরে থাকা তাঁর ভাশুর ও শাশুড়িসহ অন্যদের বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে তাঁরা জানান, খেয়াল করেননি। পরে রাতের খাবার খেয়ে তাঁরা স্বামী–স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েন। রাত দুইটার পর হঠাৎ বাড়িতে পুলিশ এসে দরজায় নক করে।
ফারহানা জানান, তাঁর স্বামী নিজেই ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দেন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। ঘরের তিনটি কক্ষ থাকলেও পুলিশ সরাসরি শোবার ঘরের তোশক উল্টে কার্তুজ ও অস্ত্র উদ্ধার করে। তাঁর স্বামী ওই অস্ত্রের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়ে বিষয়টি যাচাই করার অনুরোধ করেন পুলিশ সদস্যদের। কিন্তু পুলিশ কোনো কথা না শুনে তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। তখন তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুরের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করে পুলিশ।
ফারহানা দাবি করেন, তাঁর স্বামী ওমানে ব্যবসা করেন। অতীতে কখনো কোনো ধরনের অন্যায় কিংবা অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবেন না। তবে তাঁদের বাড়িতে জায়গা-জমি নিয়ে একটি পক্ষের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁর স্বামীকে ফাঁসানো হতে পারে। তিনি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
নবীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাবেদ একজন ওমানপ্রবাসী। এক-দেড় মাস হলো দেশে এসেছেন। এলাকার মানুষ তাঁকে নম্র ও ভদ্র হিসেবেই চেনে। পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। এ নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।’
অভিযান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিম সরকার জানান, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই প্রবাসীর বসতবাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি অস্ত্র, গুলি ও দুটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে একটি নিয়মিত মামলা করে সোমবার জাবেদকে আদালতে পাঠানো হয়।
তবে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় নিয়ে ওসি বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের নানা বক্তব্যের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অভিযান ঘিরে কোনো ধোঁয়াশা আছে কি না বা প্রকৃত ঘটনা কী, তা–ও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।’
বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা পুলিশ সুপার এন এম নাছির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসীর বাড়িতে অস্ত্র উদ্ধারের ওই ঘটনা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটি খতিয়ে দেখতে তিনি ওসিকে বলেছেন।’