একের পর এক রহস্যময় আগুন মিরসরাইয়ের এক গ্রামে,আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা

আগুনে পুড়ে গেছে ব্যবসায়ী মৃদুল নমর বাড়ির আসবাবপত্র। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জাফরাবাদ পাড়ায় একের পর এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কিত পাড়ার মানুষ। ছবিটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তোলাছবি: প্রথম আলো।

কখনো শুকনা পাতার বস্তায়, কখনো খড়ের গাদায় আবার কখনো বসতবাড়ির একাংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ঘন ঘন এমন রহস্যময় আগুন লাগার ঘটনায় আতঙ্কে আছেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের জাফরাবাদের বাসিন্দারা। গত এক সপ্তাহে ছোটখাটো আটটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে। আগুন আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন এলাকাবাসী।

জাফরাবাদ পাড়ার অবস্থান বড় দারোগাহাট বাজারের আধা কিলোমিটার পশ্চিমে। পাড়ায় দুই শতাধিক হিন্দু পরিবারের বসবাস। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাড়াটিতে গিয়ে জানা গেল, সেদিনই দুপুরে মৃদুল নম নামের এক খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীর ঘরে আগুন লাগে। আগুনে তাঁর ঘরের বেড়া ও কিছু পোশাক পুড়ে গেছে। ঘরের সামনে এনে রাখা হয়েছে আগুনে পোড়া জিনিসপত্র। সেখানে জটলা করছেন ২০-২৫ জন মানুষ। দুপুরবেলা তাঁর ঘরে কারা আগুন দিল, তা নিয়ে কথা বলছিলেন তাঁরা। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।

বাড়ির সামনে জড়ো করে রাখা হয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়া পোশাক। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জাফরাবাদ গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো।

কথা হয় জাফরাবাদ মাতৃমন্দির কমিটির সভাপতি বাবুল ধরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পাড়ার তপন ধরের বাড়ির ব্যক্তিগত মন্দিরের পাশে রাখা শুকনা পাতার বস্তায় আগুন লাগানোর মধ্য দিয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সূত্রপাত হয়। আগুনে মন্দিরের ভেতরের সোলার ব্যাটারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পুড়ে যায়। পরদিন ২৪ জানুয়ারি ভোরে পাড়ার মৃত অমিয় ধরের শুকনা খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়। ২৫ জানুয়ারি সকালে কানু নাথের বাড়ির খড়ের গাদায় ও সন্ধ্যায় অমিয় ধরের আরেকটি খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। একই দিন রতন ধরের রান্না ঘরে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ২৬ জানুয়ারি অশোক ধরের বাড়িতে জ্বালানির জন্য রাখা শুকনা পাতার বস্তায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২৭ জানুয়ারি অনুপ ধরের বসতঘরের পাশে পলিথিনে আগুন লাগানো হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পাড়ার ব্যবসায়ী মৃদুল নমর বসতঘরে আগুন লাগে।

জানতে চাইলে মৃদুল নম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুপুরে আমি ও আমার স্ত্রী বাইরে ছিলাম। ছোট নাতিকে নিয়ে আমার ছেলের বউ ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। দুপুরের দিকে ছেলের বউ হঠাৎ ঘরের বারান্দার অংশে আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার করলে স্থানীয় লোকজন এসে আগুনে নিয়ন্ত্রণে আনেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরাও এসেছিলেন।’

‘স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে এমনটি কেউ করছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রামটিতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলব। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি আমরা।’
সোমাইয়া আক্তার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মিরসরাই।

পাড়ার আরেক বাসিন্দা জুয়েল নাগ প্রথম আলোকে জানান, পাড়ায় রহস্যজনক কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে লোকজন বিষয়টি পুলিশকে জানায়। এরপর মিরসরাই থানা-পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন। তবে এতে প্রতিকার পাওয়া যায়নি। আগুন আতঙ্কে এখন গ্রামে রাতের বেলা পাড়ায় পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াছমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাফরাবাদ হিন্দু পাড়ায় কয়েক জায়গায় আগুন লাগানোর বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পাড়ার কয়েকটি জায়গায় ও একটি ঘরে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’

বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাফরাবাদ গ্রামে কয়েকটি স্থানে খড়ের গাদায় ও বসতঘরে আগুনের বিষয়টি আমি শুনেছি। এ বিষয়ে ওসির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে এমনটি কেউ করছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রামটিতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলব। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি আমরা।’