ঘটনার পরদিন জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ফায়ার সার্ভিসসহ বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) দেবেন্দ্রনাথ উরাওকে আহ্বায়ক এবং শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুল হায়াতকে সদস্যসচিব করা হয়। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বন্দরের শুল্ক কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সোনামসজিদ স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার (বিশ্ব শর্ম্মা) বলেন, দুজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমদানি করা ব্লিচিং পাউডারের নমুনা পরীক্ষার জন্য রাজশাহী শিল্প ও রাসায়নিক গবেষণা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

সোনামসজিদ স্থলবন্দরের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই মনোনীত বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ল্যান্ডপোর্ট বর্ডার ট্রেড অ্যান্ড ট্রান্সশিপমেন্ট–সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াহেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিপদজ্জনক পণ্যভর্তি ট্রাক রাখার জন্য উপযুক্ত ছাউনির ব্যবস্থা নেই বন্দরে। রাসায়নিক দ্রব্য বন্দরে ঢোকার আগে এটি পরীক্ষা করে দেখার দায়িত্ব শুল্ক কর্তৃপক্ষের। তারাও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।

default-image

আবদুল ওয়াহেদ আরও বলেন, সোনামসজিদের অপর পাশে ভারতের মহদীপুরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ব্লিচিং পাউডারভর্তি ট্রাক ১২-১৩ দিন আটকে ছিল। ওই ট্রাক সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ইয়ার্ডের মধ্যে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হয়নি। এ ছাড়া ইয়ার্ডের বাইরে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার বন্দর এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথাযথ নয়। এখানে না আছে কাঁটাতারের বেড়া, না আছে পাহাড়া, না আছে আলোর ব্যবস্থা। এসব দেখার কথা বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু এসব বিষয়ে তাদের নজরদারি নেই।

বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরে শত শত কোটি টাকার মালামাল থাকে উল্লেখ করে আবদুল ওয়াহেদ বলেন, পাশেই জনবসতিপূর্ণ গ্রাম রয়েছে। এখানে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এসব মোকাবিলা করার জন্য বন্দরের পাশেই ফায়ার সার্ভিসের একটি কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন।

আমদানি নীতিমালায় টিনের কৌটা বা প্লাস্টিকের কনটেইনারে করে ব্লিচিং পাউডার আমদানি করার কথা বলা হয়েছে উল্লেখ করে আবদুল ওয়াহেদ বলেন, আগে এভাবেই ব্লিচিং পাউডার আমদানি করা হতো। কিন্তু তা এখন আসছে প্লাস্টিকের বস্তায়। এটি নিরাপদ ব্যবস্থা নয়। এগুলোকে রাখা দরকার ঠান্ডা পরিবেশে। তা না রাখার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

সোনামসজিদ স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার (বিশ্ব শর্ম্মা) বলেন, বস্তায় করে ব্লিচিং পাউডার আমদানি হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আমদানি পণ্যবাহী ট্রাককে ইয়ার্ডের ভেতরে (পানামা পোর্ট লিংকের সীমানার ভেতরে) ঢোকাতে হয়।

রোববার ওই স্থলবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ইয়ার্ডের ভেতর গা ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে রাখা আছে শত শত ভারতীয় ট্রাক। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখানে ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ ট্রাক রয়েছে।

বন্দরের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত কি না, জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োজিত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আলিমুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ফায়ার সার্ভিসের পরামর্শমতো ব্যবস্থা রেখেছিলাম। এখন দেখি সেটা পর্যাপ্ত নয়। মানুষ ঠেকে শেখে। এখন ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।’

অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যে পর্যাপ্ত নয়, সেটি স্বীকার করেন পানামার মহাব্যবস্থাপক বেলাল উদ্দীনও। তিনি বলেন, ব্লিচিং পাউডারভর্তি ভারতীয় ট্রাকটি ইয়ার্ডের ভেতর ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন লেগে যায়। তখন এর আশপাশে পণ্যবোঝাই ট্রাক তেমন একটা ছিল না। এ জন্য বেশি ক্ষতি হয়নি।

অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন জানিয়ে বেলাল উদ্দীন বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে সোমবার বন্দরের ইয়ার্ড এলাকা পরিদর্শন করেছি। ইয়ার্ড এলাকার ১১টি স্থানে পাম্প বসানো আছে। আরও পাঁচটি স্থানে পাম্প বসাব। এ ছাড়া ৪০ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আরও দুটি ট্যাংকি বসানো হবে। এখন ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংকি আছে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন