ভরসার নাম কল্যাণভোগ

আমচাষি রবিউল ইসলাম তাঁর কল্যাণভোগ আমের বাগানে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার খয়রাবাদ এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আমের রাজ্যখ্যাত মালদা জেলার একটি নার্সারি, সময় তখন আগস্ট মাস। চারদিকে আমের মৌসুম প্রায় শেষ। এমন সময় একটি তিন বছরের গাছে ঝুলতে দেখা গেল বড় বড় আম। কৌতূহল চেপে রাখতে পারেননি সেখানে চিকিৎসা করাতে যাওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের মালি মাইনুল ইসলাম। তিনি চারা গাছটির একটি আম পেড়ে চেখে দেখলেন। কাঁচা অবস্থাতেই মিষ্টি। স্বাদ তাঁকে মুগ্ধ করল। এরপর গাছের কয়েকটি সায়ন (জোড়কলম তৈরির উপযোগী ডগা) চুপিচুপি সংগ্রহ করে দেশে ফিরলেন। সেই ডগা থেকেই আজ জন্ম নিয়েছে নতুন সম্ভাবনার এক আম—‘কল্যাণভোগ’।

প্রায় পাঁচ বছর আগে মালদা থেকে আনা সেই ডগা প্রথমে রাজশাহীর গোদাগাড়ির একটি বাগানে জোড়কলমের মাধ্যমে সংযোজন করা হয়। পরের বছরই নতুন গাছে ফল আসে। এরপর ধীরে ধীরে গোমস্তাপুরের একটি বাগানসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জাতটি। কয়েক বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদেরা আমটির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে এর নামকরণ করেন ‘কল্যাণভোগ’।

মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আজ যখন দেখি আমটি চাষিদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, তখন খুব ভালো লাগে। মালদা থেকে ডগা নিয়ে আসাটা সার্থক হয়েছে বলে মনে করি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক খালেদুর রহমান জানান, কল্যাণভোগ একটি নাবি জাতের আম। অর্থাৎ মৌসুমের শেষ দিকে এটি পাকে। বর্তমানে বাজারে সুস্বাদু ও নাবি জাতের আমের চাহিদা বেশি। ফলে চাষিদের জন্য এটি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

খালেদুর রহমান জানান, আমটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে স্থানীয় একটি গল্প। হর্টিকালচার সেন্টারটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার কল্যাণপুরে অবস্থিত। একসময় এর নাম ছিল কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টার। আবার আমটি দেশে আনার সঙ্গে যুক্ত মাইনুল ইসলামও কল্যাণপুরের বাসিন্দা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উদ্যানতত্ত্ববিদেরা এর নাম রাখেন ‘কল্যাণভোগ’।

খালেদুর রহমানের মতে, একটি বাণিজ্যিকভাবে সফল আমের যেসব বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, তার বেশির ভাগই রয়েছে কল্যাণভোগে। সাধারণত একটি কল্যাণভোগ আমের ওজন ৪৫০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। কোনো কোনো ফলের ওজন ৯০০ গ্রামও ছাড়িয়ে যায়। ফলের আকৃতি আকর্ষণীয়, মিষ্টতার মাত্রা (টিএসএস) প্রায় ২২ শতাংশ। রোগবালাই–সহনশীল হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। পরিপক্ব ফল সংগ্রহের পর প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এসব কারণে ভবিষ্যতে রপ্তানিযোগ্য আম হিসেবেও এর সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

চাষিদের কথা

বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার খয়রাবাদ এলাকায় ১২ বিঘার একটি বাগানের ১১ বিঘাজুড়ে কল্যাণভোগের চাষ হচ্ছে। সম্প্রতি বাগানটিতে গিয়ে দেখা যায়, তিন থেকে চার বছর বয়সী গাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। বাতাসে দুলছে ডাঁসা ডাঁসা আম। বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা গেছে আগ্রহ।

নাচোল মহিলা কলেজের জীববিদ্যা বিভাগের শিক্ষক হাসিবুল হাসান পরিবার নিয়ে বাগান দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাগান ঘুরে দেখলাম, আমও খেলাম। স্বাদে আমরা মুগ্ধ। অনেকেই এখন এটিকে “লেট ক্ষীরশা” বা অমৌসুমের ক্ষীরশাপাতি বলতে শুরু করেছেন।’

বাগানটির মালিক ও আমচাষি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর আম, চারা ও সায়ন বিক্রি করে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয় করেছি। এর মধ্যে শুধু সায়ন বিক্রি করেই পাঁচ লাখ টাকা পেয়েছি। এবার ৫০ লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে।’ তিনি জানান, বর্তমানে বাগানে ২৮ হাজার চারা তৈরি করা হয়েছে। প্রতি কেজি আম ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চারার চাহিদা রয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে, আর সায়ন যাচ্ছে শিবগঞ্জের আমচাষিদের কাছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ির আমচাষি মারিফুল ইসলামও কল্যাণভোগের সম্ভাবনায় আশাবাদী। তিনি এবার আরও ২ হাজার ৫০০ চারা রোপণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি খুব সহনশীল জাত। রোগবালাইও কম। তাই খরচ কম, লাভের সম্ভাবনা বেশি।’

প্রসার দরকার

মালদার একটি নার্সারিতে দেখা এক অচেনা আম থেকে শুরু হওয়া কল্যাণভোগ আম এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। অল্প সময়েই কল্যাণভোগ হয়ে উঠেছে আমচাষিদের নতুন আগ্রহ, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন আশার নাম।

হর্টিকালচার সূত্র জানায়, গত তিন বছরে সেন্টার থেকে ২০০০ চারা বিক্রি হয়েছে। চাহিদা রয়েছে আরও অনেক। কিন্তু উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বাইরে নার্সারিগুলো প্রচুর চারা উৎপাদন করছে। বেশি দামে কিনছেও আমচাষিরা।

এই নাবি জাতের সুস্বাদু আমটি আমের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন আম ও কোন আম কখন খাবেন বইয়ের লেখক, আমগবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কল্যাণভোগ আমের উদ্ভাবক মালিকে অভিনন্দন। এমন আমের প্রসার হওয়া দরকার।’