চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া শিশুকে হাসপাতালে নিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি
ট্রেনে পানির বোতল বিক্রি করত শিশুটি (১১)। চলন্ত ট্রেন থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে রেললাইনের পাশে পড়ে থাকতে দেখে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তি। গতকাল বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
আহত শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্বজনদের কারও মুঠোফোন নম্বরও সে দিতে পারেনি। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে। তাঁর নাম খোকন চৌধুরী (৪৮)। বাড়ি চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানার তেতুয়া গ্রামে। তাঁর স্ত্রী সন্ধ্যা রানী গ্রাম পুলিশ সদস্য হিসেবে কাজ করেন। খোকন একসময় পল্লিচিকিৎসক ছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেল চারটার দিকে উপজেলার ছকাপন এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি আহত শিশু ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। এ সময় শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত দেখা যায়। পরে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে কুলাউড়া রেলওয়ে থানা-পুলিশ ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা হাসপাতালে যান। তাঁরা কথা বলে ঘটনা ও তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।
শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এমনটা জানিয়েছেন বলে জানান কুলাউড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের শিশু সুরক্ষা কর্মী জাহানারা বেগম।
কুলাউড়া রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অমর চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ খোকন চৌধুরীর দেওয়া নাম-ঠিকানা যাচাই করে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। কাউকে কিছু না বলে প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। কয়েক দিন বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আবার ফিরে যান। তাঁকে বাড়ি নিয়ে যেতে স্বজনেরা কুলাউড়ায় রওনা দিয়েছেন।
রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময় খোকন চৌধুরী শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। চিকিৎসার প্রয়োজন মনে করে শিশুটিকে নিয়ে তিনি হাসপাতালে রওনা দেন। এর মধ্যে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটকান। তবে শিশুটি কীভাবে আঘাত পেয়েছে, তা তিনি বলতে পারেননি।
শিশুটির ঘাড়সহ শরীরের কয়েকটি স্থানে ‘ইন্টারনাল ফ্র্যাকচার’ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজারে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এসআই অমর চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ওষুধের প্রভাবে বুধবার বিকেল থেকেই শিশুটি ঘুমাচ্ছে। রাতে কিছু সময়ের জন্য জেগেছিল। তখন সমাজসেবা কার্যালয়ের লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে শিশুটি জানায়, সে ট্রেনে পানির বোতল বিক্রি করত। কয়েকজন লোক তার কাছে থাকা টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর তার আর কিছু মনে নেই। শিশুটি নিজের নাম-ঠিকানাও বলতে পারেনি। খোকন চৌধুরী মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও শিশুটির বিষয়ে মানবিকতা দেখিয়েছেন। তিনি সারা রাত হাসপাতালে ঘুমন্ত শিশুটির পাশে বসা ছিলেন। মাঝেমধ্যে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন।
শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এমনটা জানিয়েছেন বলে জানান কুলাউড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের শিশু সুরক্ষা কর্মী জাহানারা বেগম। উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে মৌলভীবাজার জেলা সদরে অবস্থিত ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আনিকা কাসেম মুঠোফোনে বলেন, শিশুটির ঘাড়সহ শরীরের কয়েকটি স্থানে ‘ইন্টারনাল ফ্র্যাকচার’ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজারে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।