কক্সবাজার সৈকত দখল করে ফের চার শতাধিক দোকান নির্মাণ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সুগন্ধা ও আশপাশের বালিয়াড়ি দখল করে আবারও দোকানপাট-রেস্তোরাঁ নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে রাতের অন্ধকারে বালিয়াড়ি দখল করে দোকানপাট গড়ে উঠলেও কেউ বাধা দিচ্ছেন না। গত চার-পাঁচ দিনে অন্তত চার শতাধিক দোকান-রেস্তোরাঁ বসানো হয়েছে। সৈকতের ঝাউবাগান ও অন্যান্য বালিয়িাড়ি দখল করে আরও দোকান নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৯৩০টি দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।
কয়েক দিন পর সুগন্ধা সৈকত পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, উচ্ছেদ করা বালিয়াড়িতে আর কোনো দোকান যেন না বসে, দখল না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সতর্ক থাকবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা অমান্য করে ঈদুল আজহার ছুটির সময় কতিপয় ব্যক্তি সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে চার শতাধিক দোকানপাট স্থাপন করেছে।
গতকাল শনিবার রাতেও কলাতলী সৈকত ও সিগাল হোটেলের সামনে ঝাউবাগান দখল করে বেশ কিছু দোকানপাট বসানো হয়। দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি রকমারি পণ্যসামগ্রী, কাপড়, রোদচশমা, আচার-প্রসাধনসামগ্রী, ভাজা মাছ, চা-কফি ও খাবার বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ দোকান করা হয়েছে ভ্যানের ওপর। সেগুলোর নিচে চারটি করে চাকা লাগানো। উচ্ছেদ অভিযানে নামলে যেন দ্রুত দোকানপাট অন্যত্র সরিয়ে ফেলা যায়, এ জন্য এমন ব্যবস্থা বলে দোকানিরা জানালেন।
শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সেভ দ্য কক্সবাজার শাখার সভাপতি তৌহিদ বেলাল বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি চক্র বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ দিয়ে লোকজন থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সৈকতে নামার প্রবেশ মুখে এসব ঝুপড়ি দোকানপাট পর্যটকদের দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। গত ১২ মার্চ থেকে জেলা প্রশাসন কয়েক দফায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পর পর্যটকের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু ঈদুল আজহার রাত থেকে আবার দোকানপাট নির্মাণ শুরু হওয়ায় হতাশা দেখা দেয়। প্রশাসন বাধা না দেওয়ায় যত্রতত্রে আরও স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। তাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।
আজ রোববার দুপুরে সৈকতে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, গত ১২ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে যেসব জায়গা থেকে দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল, ঠিক সেসব জায়গায় পুনরায় বসানো হয়েছে দোকানপাট। সুগন্ধা জামে মসজিদের পাশে বালিয়াড়ি দখল করে শতাধিক দোকানপাট বসানো হলেও কোনো দোকানে সাইনবোর্ড বা নাম নেই। দোকানমালিকের নাম পরিচয় জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন কর্মচারীরা।
একটি দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দোকানমালিকেরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর তাঁরা (দোকানমালিকেরা) বালিয়াড়িতে নতুন করে দোকানপাট বসানো শুরু করেন। ১২ মার্চ উচ্ছেদের আগে এই দোকান টানা ১০ বছর এখানে ছিল। দোকানে কাপড়চোপড়-আচার, চকলেটসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
পাশে ত্রিপলের ছাউনির নিচে ভ্যানগাড়ি দিয়ে বসানো কয়েকটি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুক, আচার, চা, পান-সিগারেট, প্রসাধনসামগ্রী ইত্যাদি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত একজন বিচকর্মী বলেন, ঈদের আগের রাত থেকে ঝুপড়ি দোকান বসানোর কাজ শুরু হয়। গত কয়েক দিনে চার শতাধিক দোকানপাট বসানো হয়েছে। সকাল সাতটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকানসমূহে বেচাবিক্রি চলে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে আবারও প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ-পর্যটকসহ সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে। এর দেখাদেখি অনেকে সুগন্ধা, কলাতলী, সিগাল পয়েন্টের বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছেন। এমনকি কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সৃজিত সাগরলতা এলাকা ঘিরে সেখানে রেস্তোরাঁ তৈরি ও বাজার বসানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে সুগন্ধা-কলাতলী-লাবণী পয়েন্ট থেকে ৯ শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলাম। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও ছিল। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত (উচ্ছেদ হওয়া) ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রিট করেন। আদালত থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রিটের জবাব প্রদানের পর আদালতের নির্দেশনা মতে অবৈধ স্থাপনা ও দখলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতিবছর কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক। বেশির ভাগ পর্যটক একবারের জন্য হলেও সৈকতে নামেন। পর্যটকেরা সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকানের বস্তি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে নানা অপরাধও ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ১২ মার্চ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর সৈকতে মুক্ত পরিবেশ ফিরে এসেছিল। এখন উচ্ছেদ হওয়া বালিয়াড়ি দখল করে ফের ঝুপড়ি স্থাপনা নির্মাণ করায় পুরোনো চেহারা ফিরে এসেছে। এ কারণে সন্ধ্যায় ও রাতে পর্যটকেরা সৈকতে নামতে অনীহা প্রকাশ করেন।