আয় কমা ও ব্যয় বাড়ার ফাঁদে পড়ে সংসারে টানাটানি প্রদীপের

নিজ কর্মস্থলে নরসুন্দর প্রদীপ চন্দ্র শীল। সোমবার রাত ১২টার দিকে সিলেট নগরের মদিনা মার্কেট এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

প্রতিদিন বাসা থেকে কর্মস্থলে টমটমে করে যাতায়াত করেন প্রদীপ চন্দ্র শীল (৩৫)। পেশায় নরসুন্দর প্রদীপের এ পথ যেতে আগে ভাড়া লাগত পাঁচ টাকা; এখন তা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারসহ সব ক্ষেত্র এর প্রভাব পড়েছে। তাই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

মানুষ যেকোনো উপায়ে এখন ব্যয় সংকোচন করতে চাইছে। এ কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই সেলুনে আসছে না জানিয়ে প্রদীপ বলেন, এতে তাঁর আয় কমেছে। অথচ ব্যয় বেড়েছে হয়েছে দ্বিগুণ। এ কারণে টানাটানি করে কোনোমতে চালিয়ে নিচ্ছেন সংসার।

প্রদীপ চন্দ্র শীলের বাসা সিলেট নগরের ব্রাহ্মণশাসন এলাকায়। স্ত্রী প্রতিভা রানী শীল ও সাড়ে তিন বছরের মেয়ে প্রমি রানী শীলকে নিয়ে পরিবার। ‘মা হেয়ার ড্রেসার’ নামের যে সেলুনে নরসুন্দরের কাজ করেন তিনি, এর অবস্থান নগরের মদিন মার্কেট এলাকায়।

গতকাল সোমবার রাত পৌনে ১২টার দিকে প্রদীপের সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে বসে কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, আগে যে ব্যক্তি সপ্তাহে একবার চুল কাটাতে বা শেভ করাতে আসতেন, সেই একই ব্যক্তি এখন দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একবার সেলুনে আসছেন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হরিনগর গ্রামে প্রদীপের বাড়ি। ২০ বছর আগে সিলেট শহরে এসেছেন জীবিকার জন্য। এরপর কয়েক সেলুন ঘুরে বর্তমানের কর্মস্থলে থিতু হয়েছেন। এখানে আছেন চার বছর ধরে।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চুল কাটা ও শেভ করার কাজ করেন জানিয়ে প্রদীপ বলেন, তাঁদের সেবা নেওয়ার জন্য আগের চেয়ে এখন লোকজন কম আসেন। মানুষ ব্যয় কমাতে সেলুনে কম আসছেন বলে তাঁর মনে হচ্ছে।

সবকিছুর দাম বাড়লেও চুল কাটা ও শেভের ক্ষেত্রে এখনো আগের রেট নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে এই নরসুন্দর বলেন, চুল কাটায় ৫০ টাকা, ক্রিম শেভের জন্য ৩০ টাকা ও ফোম শেভে ৫০ টাকা নিচ্ছেন তাঁরা।

সেলুন ব্যবসায় আর সুদিন নেই বলে মনে করেন প্রদীপ। তিনি বলেন, যাঁরা একসময় সেলুনে নিয়মিত শেভ করাতেন, তাঁদের অনেকে এখন বাসায় নিজেই শেভ করে নিচ্ছেন। আগে যাঁরা কিছুদিন পরপর চুল কাটাতেন, তাঁরাও এখন আর ঘন ঘন সেলুনে আসেন না। এ কারণে নরসুন্দরদের আয় কমেছে।

প্রদীপ যে সেলুনে কাজ করেন, সেখানে তিনিসহ চারজন নরসুন্দর আছেন। প্রতিদিন যে টাকা আয় হয়, এর অর্ধেক সেলুনমালিককে দিতে হয়। এরপর প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয় প্রদীপের। এর মধ্যে ঘরভাড়া ৩ হাজার ২৫০ টাকা, বিদ্যুৎ বিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং যাতায়াত বাবদ ৩০০ টাকা ব্যয় হয়। বাকি টাকায় বাজারসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটান।

গ্রামের বাড়ি থেকে আত্মীয়স্বজন এলে, কোথাও বেড়াতে গেলে বা অসুখ-বিসুখ হলে সেই মাসে টাকায় টান পড়ে বলে জানান প্রদীপ।

তিনি বলেন, ‘তখন ধারকর্জ করতে হয়। সেই ঋণ শোধ করতে গিয়াও সব সময় চাপ থাকে। তবে ছোট পরিবার হওয়ায় কুনুরকম চইলা যাইতাছে। করোনা শুরু হওয়ার আগে এক হাজার টাকাও দৈনিক রুজি করছি। এরপর থাকি ধীরে ধীরে ভাঙতিত (বিপর্যয়) পড়ছি। জিনিসপত্রের দাম যে রকম বাড়তাছে, ভালামন্দ খাইয়া বাঁচবার আর সুযোগ নাই। সামনে যে কোন কঠিন সময় আইতাছে, বুঝতাছি না।’