পুরোনো জিনিসে স্বজনের স্মৃতি, আগলে রাখছে সুন্দরবন জাদুঘর
একসময় গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের সময় গরুর মুখে পরানো হতো গোল ঝুড়ির মতো একটি জিনিস। স্থানীয় মানুষ এটিকে বলতেন ‘ঠুসি’। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পূর্ব ধানখালী গ্রামের সখী রানী মণ্ডলের (৪৬) বাড়িতেও ছিল একটি ঠুসি। বহুদিন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ঠুসিটি একদিন তিনি তুলে দেন বাড়ি থেকে কাছেই একটি সংগ্রহশালার কর্মীর হাতে।
এখন সেই পুরোনো ঠুসি সযত্নে সাজানো আছে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব ধানখালী গ্রামের ‘সুন্দরবন মিউজিয়ামে’। সখী রানী মাঝেমধ্যে সেখানে যান। নিজের দেওয়া জিনিস দেখেন।
শুধু সখী রানী নন, সংগ্রহশালার প্রায় প্রতিটি পুরোনো জিনিসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কারও না কারও স্মৃতি। পূর্ব ধানখালীর সুবোধ মণ্ডলের (৫২) দেওয়া একটি ক্যাসেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর মামার স্মৃতি। ক্যাসেটটি দেওয়ার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে সুবোধ বলেছিলেন, ‘আমার মামা এটা আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি এখন নেই। এত দিন ধরে আগলে রেখেছি। আপনারা এটাকে আগলে রাখবেন।’
সড়কের পাশে সংগ্রহশালা
সম্প্রতি এক দুপুরে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন হয়ে সুন্দরবনের পথে যেতে সড়কের পাশেই চোখে পড়ে ‘সুন্দরবন সংগ্রহশালা’ লেখা বড় সাইনবোর্ড। পূর্ব ধানখালী গ্রামে বেসরকারি সংস্থা ‘প্রেরণা’র উদ্যোগে ২০২৫ সালে গড়ে তোলা হয়েছে এই সংগ্রহশালা। উপকূলের মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও হারিয়ে যেতে বসা নানা নিদর্শন সংরক্ষণই এর উদ্দেশ্য।
ভেতরে ঢুকলে চারপাশে চোখে পড়ে সবুজ শস্যখেত, বাঁশের বেড়া আর ছোট পুকুরে ফুটে থাকা লাল শাপলা। চত্বরের এক পাশে কাঠের পালকি, জাঁতা, ঢেঁকি, মাটির পাত্রসহ গ্রামবাংলার পুরোনো দিনের নানা সামগ্রী। পাশে সারিবদ্ধ সাদা ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপকূলের মানুষের কাছে পরিচিত বনবিবির কাহিনির বিভিন্ন চরিত্র।
কাঠের তৈরি মূল ঘরটির সামনে লেখা ‘সুন্দরবন মিউজিয়াম’। ভেতরে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, গরানসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের নমুনা ও ফল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কাচের বোতলে রাখা আছে সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদীর জোয়ার-ভাটার পানির নমুনা। আছে শতাধিক দেশি শাকসবজির বীজ। পুরোনো ক্যামেরা, রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, সাদা–কালো টেলিভিশন, হারিকেন, লোহার ট্রাংক, খড়ম, মাছ ধরার সরঞ্জামসহ কৃষিকাজের নানা উপকরণও আছে।
প্রেরণার কর্মী বৃষ্টি মণ্ডল একটি সাদা–কালো টেলিভিশন দেখিয়ে বলেন, হরিণগর এলাকার এক ব্যক্তি নিজের হাতে এর কাঠের ফ্রেম ও পেছনের কাঠামো তৈরি করেছিলেন। এখানে আছে শ্যামনগরের নকিপুর জমিদারবাড়ির পুরোনো স্থাপনার নকশা ও কিছু অংশ। বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাও আছে। পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে আছে ১৯৫৮ সালের একটি দরখাস্ত, চিঠি, স্ট্যাম্প, পোস্টার, জীবনবিমার কাগজ, পঞ্জিকা এবং বনবিবির পূজার পাঁচালি।
পুরোনো জিনিসে জড়ানো মায়া
জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষের আবেগের নানা গল্পও পেয়েছেন প্রেরণার কর্মীরা। কর্মী ছন্দা মল্লিক বলেন, ‘যাঁর কাছে যা ছিল, সাধ্যমতো আমাদের দিয়েছেন।’ অনেকে পুরোনো জিনিস দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণও হয়েছেন।
একবার এক বৃদ্ধার বাড়িতে গিয়ে কর্মীরা দেখেন, তিনি বসে পান খাচ্ছেন। যে কৌটা থেকে পান বের করছিলেন, সেটি ছিল পুরোনো আমলের সিসার কৌটা। সংগ্রহশালার কথা বলতেই তিনি হাসিমুখে পান সরিয়ে কৌটাটি দিয়ে দেন। ছন্দা বলেন, জিনিসটি পুরোনো বা ভাঙাচোরা হলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বড়।
প্রেরণার কর্মীরা জানান, শুরুতে সংগ্রহশালায় কী কী জিনিস রাখা হবে, তার একটি তালিকা করা হয়েছিল। এর প্রায় ৮০ শতাংশ জিনিস এরই মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগ্রহের কাজ এখনো চলছে।
সাত বছরের ছেলে মিহির বর্মণকে নিয়ে সংগ্রহশালা দেখতে এসেছিলেন পূর্ব ধানখালীর সুধারানী বর্মণ (৩৭)। তিনি বলেন, ‘এখানে পুরোনো দিনের এমন অনেক জিনিস রাখা আছে, যেগুলো এখন আর সচরাচর দেখা যায় না। তাই ছেলেকে এসব দেখাতে নিয়ে এসেছি। জিনিসগুলো দেখে নিজের ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়ে।’
প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার ক্ষতি টাকায় মাপা যায় না। নতুন প্রজন্ম যেন পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য জানতে পারে, সে উদ্দেশ্যেই ২০২৫ সালে সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি নিদর্শন এখন তাঁদের সংগ্রহে আছে। ভবিষ্যতে সংগ্রহ বাড়লে আরও তিন-চারটি ঘর করার পরিকল্পনা আছে। এই উদ্যোগ একদিন বড় এক ঐতিহ্য সংগ্রহশালায় পরিণত হবে, এটাই তাঁদের স্বপ্ন।