পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ঘিরে কী হলো, জানালেন স্বজন ও স্থানীয়রা

পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে দাফনের সময় তাঁর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেনছবি: সংগৃহীত

পিরোজপুর সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে চিতলিয়া গ্রাম। এই গ্রামেই শনিবার গভীর রাতে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন স্বজনেরা। তখন পুলিশ উপস্থিত ছিল।

গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় পিরোজপুর সদর উপজেলায় মানিক পশারীর বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া গেল না। চারদিকে কেমন যেন নীরবতা। এই বাড়ি থেকে কিছুটা সামনে এগোলে মানিক পশারীর বোন হেনার (৪৮) বাড়ি। ডাকাডাকির পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ভাইয়ের মৃত্যু ও দাফন নিয়ে কোনো কথা বলতে চান না। একপর্যায়ে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে হেনা বলেন, তাঁদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, মানিক পশারীর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হবে, মরদেহ আটকে রাখা হবে এবং পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে আসতে দেওয়া হবে না। এমনকি এলাকার ছোট বাচ্চাদেরও বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না বলে ভয় দেখানো হয়েছিল।

আরও পড়ুন

হেনার বাড়ি থেকে বের হয়ে আরও কিছুটা এগোলে মানিক পশারীর আরেক বোন রিনার (৬০) বাড়ি। তিনি সেদিনের ঘটনার বিষয়ে বলেন, দাফনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে নিরাপত্তার আশঙ্কায় বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে ছিলেন মানিক পশারী। দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

দুই বোন বলেন, হুমকির কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকে তাঁদের সহযোগিতা করতে সাহস পাননি। ভাইয়ের মরদেহ দাফনের জন্য কবর খুঁড়ে দেওয়ার লোক খুঁজে পেতেও তাঁদের বেগ পেতে হয়।

মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে ছিলেন মানিক পশারী। দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয় যে নয়জন বাসিন্দার সঙ্গে গতকাল প্রথম আলো কথা বলেছে, তাঁদের কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রত্যেকে বলেছেন, নাম প্রকাশ করে কথা বললে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতে পারে।

মানিক পশারীকে পিরোজপুরে গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে শনিবার উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় কিছু লোক তাঁকে এখানে দাফন না করার দাবি জানান। এ সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায়।

জানাজার অপেক্ষার মধ্যেই কবর ভরাট

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানিক পশারীর দাফনের জন্য চিতলিয়া গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা জানাজার অপেক্ষায় ছিলেন।

স্থানীয় যে নয়জন বাসিন্দার সঙ্গে গতকাল প্রথম আলো কথা বলেছে, তাঁদের কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রত্যেকে বলেছেন, নাম প্রকাশ করে কথা বললে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কবর ভরাট করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নানা শঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়। যে কারণে জানাজার জন্য অপেক্ষা করা অনেকেই নিরাপত্তার কথা ভেবে সরে যান।

স্থানীয় এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিবিরের সাবেক নেতা মুইন উদ্দিন (ছোট মুইন নামেও পরিচিত) সাতটি মোটরসাইকেলে কয়েকজনকে নিয়ে চিতলিয়া গ্রামে আসেন। তাঁদের একজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। এরপর কয়েকজন কবরস্থানে ঢুকে খুঁড়ে রাখা কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেন এবং গালাগাল করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী
ছবি: সংগৃহীত

বিষয়টি নিয়ে আরও দুজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কবর ভরাট করে ওই ব্যক্তিরা চলে যাওয়ার পর পারেরহাট বাজারের দিক থেকে আরও লোকজন এলাকায় আসেন। আনুমানিক ১৫০ জনের মিছিল থেকে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। ‘মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরের মাটিতে হবে না’ এবং ‘মানিক পশারীর আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’—এ ধরনের স্লোগান দেওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কবর ভরাট করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নানা শঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়। যে কারণে জানাজার জন্য অপেক্ষা করা অনেকেই নিরাপত্তার কথা ভেবে সরে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ব্যক্তি বলেন, এলাকার কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে দাফনে অংশ নিতে আসা লোকজনকে সরিয়ে দেন। তাঁদের বলা হয়েছে, যারা লাশ নিয়ে দৌড়াচ্ছে, ইতিমধ্যে আটজনের নামে মামলা হয়েছে, নারীদের নামেও মামলা হয়েছে এবং নারী পুলিশ আসবে। এসব কথা শুনে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফনের আগে আতঙ্ক তৈরি করার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত–শিবিরের কিছু নেতা–কর্মী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল জেলা জামায়াতে ইসলামীর একাধিক শীর্ষ নেতার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। তবে কেউ ফোন ধরেননি।

পুলিশ লাইনসের ভেতরে যখন গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, তখন জানাজায় আপনজন বলতে আমি একাই ছিলাম। এ ছাড়া পুলিশের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। কোনো আত্মীয়স্বজন জানাজা পড়তে পারেননি।
মো. ফারুক, মানিক পশারীর জামাতা

অবশ্য গত শনিবার রাতে পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জহিরুল হক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘মানিক পশারীর দাফনের বিষয়ে আমাদের কোনো বাধা ছিল না। তবে দাফনের ব্যাপারে আমাদের কোনো সহযোগিতাও ছিল না। কাদের ছত্রচ্ছায়ায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় দাফন হয়েছে, তা আমরা কিছুই জানি না।’

প্রথম জানাজায় ছিলেন শুধু জামাতা

মানিক পশারীর মৃত্যুর পর গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁর মরদেহ নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদে আসেন। পরে মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা মো. ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ লাইনসের ভেতরে যখন গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, তখন জানাজায় আপনজন বলতে আমি একাই ছিলাম। এ ছাড়া পুলিশের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। কোনো আত্মীয়স্বজন জানাজা পড়তে পারেননি।’

আরও পড়ুন

পরিবারের সদস্যরা জানান, শনিবার রাত ১১টার দিকে তাঁরা জানতে পারেন, পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে পুলিশ লাইনস থেকে মরদেহ বের করে দাফনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। এরপর আর দেরি না করে আবারও কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেন তাঁরা। তবে কাউকে পাশে পাচ্ছিলেন না।

সেদিন মানিক পশারীর বোনদের সঙ্গে কবর খুঁড়তে এগিয়ে এসেছিলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা (৪৩)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মানিক পশারীর এক বোন কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে এসে বলেন—ভাইকে একটু কবরে রাখবেন, এমন কোনো লোক পাচ্ছেন না যে কবর খুঁড়ে দেবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারীর বাড়িটির মূল বসতভিটা আগুনে পুড়ে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। আগুনে পুড়েছে মানিক পশারীর ছোট দোকানটিও।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তাঁর কান্না দেখে আমার মায়া হয়। পরে সাহস করে বের হই। আমি খন্তা দিয়ে মাটি খুঁড়েছি, তিন বোন মাটি তুলেছে। পরে গ্রাম পুলিশের একজনও সহযোগিতা করেন। আরও একজন কবর খুঁড়তে এসেছিলেন।’

এরপর শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মানিক পশারীর মরদেহ নিজ বাড়ির কবরস্থানে দাফন করা হয়। দাফনের সময় তাঁর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ থাকায় দাফন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন

এখনো আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা

মানিক পশারীর একমাত্র ছেলে আসাদুল (৩৬) ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ মাস আগে মারা যান। পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই মানিক পশারীর মৃত্যু এবং তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

দাফনের আগে যেভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে, তাতে এখনো তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে সাহস পাচ্ছেন না। বাড়ির আশপাশে লোকজনের আনাগোনা এবং ভবিষ্যতে আরও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।
হেনা, মানিক পশারীর বোন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারীর বাড়িটির মূল বসতভিটা আগুনে পুড়ে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। আগুনে পুড়েছে মানিক পশারীর ছোট দোকানটিও। বাড়ির পাশের একটি ঘরে থাকতেন তাঁর প্রয়াত ছেলে আসাদুলের স্ত্রী। শ্বশুরের দাফনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি ঘটনার রাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানিক পশারী পিরোজপুরের বাড়িতে থাকতে পারেননি। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে ছিলেন
ছবি: প্রথম আলো

মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দাফন নিয়ে উত্তেজনা ও হুমকির কারণে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে শোক পর্যন্ত পালন করতে পারেননি। এখন হুমকির ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

মানিক পশারীকে দাফন করা হলেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আতঙ্ক কাটেনি। দাফনের পরও তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।

আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে তাঁর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করব।’
মো. শরীফুল ইসলাম, ওসি, পিরোজপুর সদর থানা

মানিক পশারীর বোন হেনা বলেন, দাফনের আগে তাঁদের যেভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে, তাতে এখনো তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে সাহস পাচ্ছেন না। বাড়ির আশপাশে লোকজনের আনাগোনা এবং ভবিষ্যতে আরও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে রয়েছে।

এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে তাঁর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করব।’