default-image

সাবিনার বাবা মো. সৈয়দ আলী গাজী ২০২০ সালে মারা গেছেন। পাঁচ বোনের বড় দুই বোন লেবাননে থাকতেন। বাবার মৃত্যুর পর বড় বোন সালমা খাতুন দেশে থেকে গেছেন। তিনিই এখন পরিবারের কর্ত্রী।

সালমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলাটা সংগ্রামের। বাবা ফেরিওয়ালা ছিলেন। তাঁর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টের ছিল। বাবাও চাননি বোন ফুটবলে আসুক। সাবিনার সাবিনা হওয়াটা সব আকবর স্যারের অবদান। বোন এখন দেশ-বিদেশে খেলে। সব সময় গোল করে যাচ্ছে। এবারের টুর্নামেন্টে অনেক ভালো করছে। দুটি হ্যাটট্রিক করেছে। অবশ্য পুরো দলই ভালো খেলছে। সবকিছু মিলে খুবই গর্ব হচ্ছে ওর জন্য, ওদের জন্য।’

শিরোপা জেতার পর বাবাকে খুব মিস করেছেন সাবিনার বোনেরা। পাশাপাশি সাবিনার কোচ ‘আকবর স্যার’কে মনে পড়ছে তাঁদের। সালমা খাতুন বলেন, ‘সাবিনার যেখানেই খেলা থাকত, বাবা চলে যেতেন। আজ বাবা থাকলে খুব খুশি হতেন। আর আকবর স্যার তো বাবার স্নেহে সাবিনাকে গড়ে তুলেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় সাবিনার সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো না। স্যারই এগুলো দেখতেন। স্যারও কয়েক দিন আগে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন।’

আমাদের ছোটবেলাটা সংগ্রামের। বাবা ফেরিওয়ালা ছিলেন। তাঁর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টের ছিল। বাবাও চাননি বোন ফুটবলে আসুক। সাবিনার সাবিনা হওয়াটা সব আকবর স্যারের অবদান। বোন এখন দেশ-বিদেশে খেলে। সব সময় গোল করে যাচ্ছে। এবারের টুর্নামেন্টে অনেক ভালো করছে। দুটি হ্যাটট্রিক করেছে। অবশ্য পুরো দলই ভালো খেলছে।
সালমা খাতুন, বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাবিনার বোন
default-image

চ্যাম্পিয়ন নারী ফুটবল দলের সদস্য সাতক্ষীরার আরেক মেয়ে মাসুরার পরিবারও ভীষণ খুশি। মাসুরার বাবা মো. রজব আলী দলের জয় শেষে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো আপনাদের আগেই বলেছিলাম বাংলাদেশ জিতবে। শরীরটা ভালো না, তারপরও অন্য রকম আনন্দ কাজ করছে। জয়ের পর আনন্দে বাড়ির পাশের মেলায় চলে এসেছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন।’

সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে বিনেরপোতা এলাকায় মাসুরার বাড়ি গেলে তাঁর বাবা জানান, মেয়ে ফুটবল খেলুক, চাননি রজব আলী। তবে মেয়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে তাঁকে। অবশ্য মেয়ের জেদের চেয়ে মাসুরার কোচ আকবর আলীর চেষ্টা ও স্ত্রী ফাতেমা বেগমের চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছেন রজব আলী। এখন মেয়েকে নিয়ে গর্ব করেন বাবা।

কথায়–কথায় উঠে আসে মাসুরা ওরফে মুক্তার সংগ্রামী জীবনের গল্প। মাসুরার বাবা রজব আলীর বাড়ি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের আলাইপুর গ্রামে। রজব আলী অল্প বয়সে সাতক্ষীরায় এসে আর ফিরে যাননি। শহরের বিভিন্ন এলাকার ভাড়া বাসায় থাকেন। শহরের নানা জায়গায় চায়ের দোকান চালান। ভ্যানে করে ফল-সবজি বিক্রি করেছেন। শ্বাসকষ্ট ও হৃদ্‌রোগের সমস্যায় এখন সেভাবে কাজ করতে পারেন না তিনি। মাসুরারা তিন বোন। সবার বড় মাসুরা। মেজ মেয়ে সুরাইয়াকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে সুমাইয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।

জাতীয় দলের ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের ফুটবলে আসার গল্প বলতে গিয়ে রজব আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ও যখন ক্লাস থ্রিতে, তখন থেকেই ফুটবল ধরে। পিটিআই স্কুলের মাঠে মেয়েদের খেলার অনুশীলন করাতেন আকবর ভাই। সাবিনারা তখন ওখানে অনুশীলন করত। ক্লাস শেষ হওয়ার পর মাসুরা মাঠেই থাকত। মেয়েদের বল কুড়াত। এসব করতে করতে ওদের সঙ্গে একটা ভালো জানাশোনা তৈরি হয়। খেলতেও শুরু করে। আমি তখন খুব অসুস্থ। কাজ করতে পারি না। সংসার চালানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। আবার মেয়ে যে মাঠে খেলে, আমি কিছুই জানতাম না। শেষে আকবর ভাইয়ের নানা পরামর্শে বাধ্য হই খেলায় দিতে।’

মাসুরার মা ফাতেমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের খুব অভাব ছিল। মাঝেমধ্যে ঘরে খাবারও থাকত না। টাকার জন্য ওর বাবার চিকিৎসা করাতে পারিনি। মেয়ে ছিল খেলাপাগল। খেলা ছাড়া কিছুই বোঝে না। এখনো খেলার প্রতি সেই আগ্রহ। বিয়ের কথা বললে বকা দেয়। ওর ছোটবেলায় আমিও চাইতাম, মেয়ে খেলার মধ্যে থাকুক। বৃষ্টির দিনও সে প্র্যাকটিসে যেত। ওর বাবার সঙ্গে খেলা নিয়ে যে কতবার ঝগড়া হয়েছে, তার ঠিক নেই। অনেক দিন রান্না হতো না। ও না খেয়ে চলে যেত।’

একসময় মেয়েকে খেলতে দিতে না চাওয়া রজব আলী এখন মেয়ের জন্য গর্ব করেন। রজব আলী বলেন, মেয়ের জন্য এখন অনেক গর্ব হয়। মানুষ যখন বলে মাসুরার বাবা, তখন অনেক ভালো লাগে। ওর বদৌলতে ডিসি-এসপির সঙ্গেও কথা হয়। মেয়ে সংসারের সব কাজে যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেয়, তা বলে বোঝানো যাবে না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন