জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণচেষ্টার বিচারের দাবিতে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ, আট ঘণ্টা পর প্রত্যাহার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও প্রশাসনের জবাবদিহির জন্য করা অবরোধ কর্মসূচি আট ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে ঝোলানো তালা বহাল থাকবে বলে জানান তাঁরা।
রোববার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনে তালা খুলে অবরোধ প্রত্যাহার করেন তাঁরা। এর আগে সকাল ১০টার দিকে নতুন প্রশাসনিক ভবনের দুটি ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবরোধ করেন বিভিন্ন বিভাগের একদল নারী শিক্ষার্থী।
১২ মে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলতুন্নেছা হল–সংলগ্ন সড়ক থেকে টেনেহিঁচড়ে এক ছাত্রীকে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় একজনকে অজ্ঞাত আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করে প্রশাসন। ঘটনার পাঁচ দিন পার হলে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আসামি।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রোববার সকাল ১০টার দিকে নতুন প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেন। অবরোধের পর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ভবন থেকে প্রবেশ ও বের হতে দেননি আন্দোলনকারীরা। কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার দুই ঘণ্টা পরও ভবনে অবরুদ্ধ ছিলেন। পরে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের মামলা ও তদন্ত কমিটির বিষয়ে বিস্তারিত সর্বশেষ তথ্য জানান। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে উপাচার্যের কাছে দাবি জানান, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা সাত দিনের পরিবর্তে তিন দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং আসামিকে তিন দিনের মধ্যে চিহ্নিত করতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষার্থীরা এমন দাবি জানালেও উপাচার্য স্পষ্ট করে কোনো উত্তর দেননি। ঠিক একই সময়ে ভবনের মধ্যে আটকে থাকা কর্মচারীরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে ভবনের তালা খুলে দেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একজন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘আমাদের অবরোধ কর্মসূচিটি ছিল মূলত প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মামলার বিষয়ে আপডেট তথ্য জানা। উপাচার্য স্যার আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আসামি সম্পর্কে অগ্রগতির বিষয়ে জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি সাত দিনের পরিবর্তে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং অপরাধীকে আগামী তিন দিনের মধ্যে চিহ্নিত করার কথা জানানো হয়েছে। আমরা চাই, অপরাধীকে অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা।
উপাচার্যকে ফ্যাসিস্ট আখ্যার প্রতিবাদ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় গত শনিবার উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে উপাচার্যের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেন। এর প্রতিবাদে রোববার দুপুরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন উপাচার্যের নিজ বিভাগ দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতী। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি জুলাইয়ের সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা, যিনি ক্যাম্পাসে জুলাইয়ের আগে থেকে আওয়ামী লীগের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আন্দোলন করেছেন, সেই ভিসি স্যারকে পর্যন্ত গতকাল ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য এবং জুলাই আন্দোলনকারী সব স্টেকহোল্ডারের জন্য চরম লজ্জার এবং অপমানের। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।’
ছাত্রদলের প্রতিবাদ
এদিকে উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। গত শনিবার রাতে সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ অন্তর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ছাত্রদল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ছাত্রদল সব ধরনের যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করে। একই সঙ্গে তারা মনে করে, এ ধরনের জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সচেতন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা জরুরি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে “সাধারণ শিক্ষার্থীদের” ব্যানারে পরিচালিত আন্দোলনের একপর্যায়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়।’