‘সিলেটি দামান্দ’ তারেক রহমানকে বরণে শ্বশুরবাড়িতে রান্না হচ্ছে ৪০ ডেগ আখনি

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শ্বশুরবাড়িতে আসছেন। এ উপলক্ষে চলছে নানা আয়োজন। আপ্যায়নের জন্য রান্না করা হচ্ছে ৪০ ডেগ আখনি। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামেছবি: আনিস মাহমুদ

সারি বেঁধে চুলায় বড় বড় ডেগে (পাতিল) রান্না হচ্ছে। নামানো হচ্ছে একটির পর একটি। একে একে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ডেগগুলো। রান্না হয়ে গেলে এগুলোর ঢাকনা খুলে নাড়াচাড়া করে দেখছিলেন বাবুর্চি। আজ বুধবার বিকেলে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামের ‘মিনিস্টার’ বাড়িতে দেখা গেছে এমন চিত্র।

ওই বাড়ি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়ি। তারেক রহমানের শ্বশুর ছিলেন নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান। পরে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীও ছিলেন। এ জন্য বাড়িটিকে মিনিস্টার বাড়ি হিসেবে সবাই চেনেন।

প্রায় ১২ হাজার মানুষের জন্য ৪০ ডেগ আখনি রান্না করা হচ্ছে। আটটি গরু, ৩৪ বস্তা চালের আখনি রান্না হচ্ছে। এতে ৫০ জন বাবুর্চি অংশ নিচ্ছেন। আজ সকাল থেকে রান্নার আয়োজন শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, রান্না খেয়ে প্রশংসা করবেন এলাকার জামাই তারেক রহমান
মো. হাসু মিয়া, রান্নার দায়িত্বে থাকা প্রধান বাবুর্চি

আজ রাতে সিলেটে এসে পৌঁছাবেন তারেক রহমান। রাতেই সিলেটের শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)–এর মাজার জিয়ারত শেষে তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানের পৈতৃক বাড়ি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিরাইমপুর গ্রামে যাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি জুবাইদার পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কবর জিয়ারত করবেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও জুবাইদার পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে মিলাদ মাহফিল শেষে তারেক রহমান এবং তাঁর সফরসঙ্গীসহ দলীয় নেতা-কর্মী ও এলাকার লোকজনের জন্য খাবার পরিবেশন করা হবে। এটি বিতরণ করা হবে ‘শিরনি’ হিসেবে।

রান্নার দায়িত্বে থাকা প্রধান বাবুর্চি মো. হাসু মিয়া বলেন, ‘প্রায় ১২ হাজার মানুষের জন্য ৪০ ডেগ আখনি রান্না করা হচ্ছে। আটটি গরু, ৩৪ বস্তা চালের আখনি রান্না হচ্ছে। এতে ৫০ জন বাবুর্চি অংশ নিচ্ছেন। আজ সকাল থেকে রান্নার আয়োজন শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, রান্না খেয়ে প্রশংসা করবেন এলাকার জামাই তারেক রহমান।’

তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের চাচাতো ভাই নাসির আলী খান রান্নাসহ বাড়িতে আসা লোকজনের তদারক করছিলেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আপা, দুলাভাই আসবেন। তাদের বরণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’

বিকেলে জুবাইদা রহমানের গ্রামের বাড়িতে দেখা হয় সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল মালিকের সঙ্গে। তিনি দলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন আয়োজন ঘুরে দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান শুধু দলের চেয়ারম্যানই নন, তিনি আমাদের ভগ্নিপতি। দীর্ঘদিন পর তিনি শ্বশুরবাড়িতে আসছেন, এতে এলাকার বাসিন্দা হিসেবে আমরা অত্যন্ত খুশি।’

আবদুল মালিক বলেন, ‘দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সিলেটে মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেন। এরই পরম্পরায় দলের বর্তমান চেয়ারম্যানও সিলেটে মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রচারণা শুরু করবেন।’

তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে তাঁর শ্বশুর বাড়ির পথে বিভিন্ন বিলবোর্ড ও তোরণ স্থাপন করা হয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

মিনিস্টার বাড়িতে পৌঁছানোর পথে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন বিলবোর্ড ও তোরণ বানানো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা এসব বানিয়েছেন। কোনো কোনো বিলবোর্ড ও তোরণে ‘দুলাভাইকে পুণ্যভূমিতে স্বাগতম’, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগতম’ ইত্যাদি লেখা দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, জুবাইদা রহমানের বাড়িতে প্রবেশের আগে সড়কে লাগানো হয়েছে পাশাপাশি ছয়টি তোরণ। বাড়ির প্রবেশ ফটকের মুখে পরিবারের সদস্যদের সৌজন্যে লাগানো হয়েছে আরও একটি তোরণ। তোরণ পেরিয়ে লাল ফটক। ফটক পেরোনোর পর বড় পুকুর। পুকুরপাড় ঘেঁষে যেতে হয় জুবাইদা রহমানের বাড়ি। এর মধ্যে পুকুরপাড়ে প্রথমে একটি এবং ভেতরে আরও দুটি বাড়ি। তিনটি বাড়ি ঘিরেই ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা লাগানো দেখা গেছে। বাড়িগুলোর প্রবেশপথে আলোকিত করার জন্য লাগানো হয়েছে বাতি। বাড়িগুলোর মধ্যে পুকুরপাড়ের বাড়ির পাশে শামিয়ানা টাঙিয়ে বেশ কয়েকটি চেয়ার পেতে রাখা হয়েছে। বাড়ির পাশেই রান্নার আয়োজন চলছে।

স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে জুবাইদা রহমানের বিয়ে হয়। ২০০৪ সালে দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শ্বশুরবাড়িতে প্রথমবারের মতো গিয়েছিলেন। ২১ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো তিনি সেখানে যাচ্ছেন।

জনসভার মাঠে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

তারেক রহমান সিলেট সফরকালে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নগরের চৌহাট্টা এলাকার সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন। এ জন্য চলছে নানা আয়োজন। শ্রমিকেরা মঞ্চ তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ সারছেন। আশপাশে হকাররা বিক্রি করছেন প্লাস্টিকের ধানের শীষ ও কোটপিন, বিএনপির পতাকা, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি। আজ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে এমন দৃশ্য দেখা গেছে সিলেট নগরের চৌহাট্টা এলাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামীকাল বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভা; দ্বিতীয়ত, তাঁর (তারেক রহমান) শ্বশুরবাড়ি সিলেটে। তিনি আমাদের সিলেটি দামান্দ (জামাই)। সব প্রস্তুতি এখন শেষ, জামাইকে বরণ করে নিতে সিলেটবাসী অধীর আগ্রহে এখন অপেক্ষা করছেন।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করবেন। এদিন ভাষণ দেবেন চৌহাট্টা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশে। প্রস্তুত করা হয়েছে মঞ্চ। বুধবার বিকেলে
ছবি: প্রথম আলো

এদিকে বিকেলে নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে সিলেট মহানগরের পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে যান। এ সময় সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলেন, আজ রাতে আকাশপথে তারেক রহমান সিলেটে পৌঁছাবেন। এরপর তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। রাত ১০টার দিকে তিনি শ্বশুরবাড়িতে যাবেন। সেখানে পারিবারিক দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেবেন। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানও থাকবেন। পরে রাতযাপনের জন্য তারেক রহমান সস্ত্রীক বিমানবন্দরের পাশে অবস্থিত পাঁচ তারকাবিশিষ্ট গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে যাবেন।

একই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামীকাল সকাল ১০টায় হোটেলে অরাজনৈতিক কিছু তরুণের সঙ্গে তারেক রহমান মতবিনিময় করবেন। বেলা ১১টার দিকে তিনি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন। এ সভা শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকায় ফিরবেন। এ সময় তিনি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর এবং হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় আয়োজিত দুটি সভায় বক্তব্য দেবেন।