দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল প্রিন্টার, ৫ লাখ টাকার যন্ত্র মিলবে ২৮ হাজারে

চুয়েটের শিক্ষার্থীদের একটি দলের তৈরি করা ব্রেইল প্রিন্টার—সিঙ্ক রোবোটিকস। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সিদ্ধার্থ মিস্ত্রী। জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পড়াশোনার প্রয়োজনে প্রায়ই নিজের মতো করে নোট বা পড়ার উপকরণ তৈরি করতে হয় তাঁকে। তবে অন্যরা এ ক্ষেত্রে যত সহজেই কোনো পিডিএফ বা ওয়ার্ড ফাইল থেকে প্রিন্ট করে নিজের পড়ার উপকরণ সাজাতে পারেন, তাঁর জন্য তা তেমন সহজ নয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য নির্ধারিত ‘ব্রেইল’ পদ্ধতিতে লেখা ছাপানোর জন্য তাঁর প্রয়োজন বিশেষ ধরনের প্রিন্টার, যার দাম অনেক বেশি।

সিদ্ধার্থর মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এই সীমাবদ্ধতার কথা ভেবেই একটি ব্রেইল প্রিন্টার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ। তাঁর সেই পুরোনো ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীদের একটি দল, ‘সিঙ্ক রোবোটিকস’। অধ্যাপক আহসানউল্লাহর সহায়তায় তাঁরা তৈরি করেছেন ছোট আকারের ব্রেইল প্রিন্টার, যার নাম ‘সিঙ্ক ভি-১’। বিদেশের বাজারে প্রচলিত প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দামের ব্রেইল প্রিন্টারের বিকল্প হিসেবে মাত্র ২৮ হাজার টাকা খরচে এটি তৈরি করেছেন তাঁরা।

অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহর দিকনির্দেশনায় ব্রেইল প্রিন্টার তৈরির এই দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন চুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ তরফদার। দলে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইফাজ হোসেন ও পুরকৌশল বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ইমাম রশিদ।

ভাবনার শুরু প্রায় ২০ বছর আগে

ব্রেইল পদ্ধতিতে কাগজের ওপর উঁচু উঁচু বিন্দু তৈরি করে অক্ষর ও শব্দ লেখা হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আঙুলের স্পর্শে সেই বিন্দু অনুভব করে পড়তে পারেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে এসব বিন্দু তৈরি করা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। আর আধুনিক ব্রেইল প্রিন্টারগুলো আকারে বড় এবং দামেও বেশ চড়া। ফলে ব্যক্তিগতভাবে অনেকের পক্ষে এসব যন্ত্র কেনা সম্ভব হয় না।

বিষয়টি নিয়ে ২০০৫ সালের দিকে ভাবনা শুরু করেন অধ্যাপক আহসানউল্লাহ। ভাবতে থাকেন, কীভাবে কম ব্যয়ে এ ধরনের প্রিন্টার তৈরি করা যায়। তখন তিনি এবং কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম একটি গবেষণার মাধ্যমে বাংলা ব্রেইল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষায় ব্রেইল লেখার প্রযুক্তি তৈরি করা। এ নিয়ে তাঁরা একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেন। তবে গবেষণাপত্র প্রকাশের পরও বিষয়টি নিয়ে থেমে থাকেননি অধ্যাপক আহসানউল্লাহ। তাঁর ইচ্ছা ছিল, গবেষণার ধারণাটিকে একটি বাস্তব যন্ত্রে রূপ দেওয়া।

আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই প্রিন্টার যেন প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এটি হবে বহনযোগ্য, আকারে ছোট এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য। এর সঙ্গে ভয়েস সুবিধা ও কিবোর্ডের শব্দ যুক্ত করার চিন্তাও ছিল, যাতে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেই লেখা সম্পাদনা করে প্রিন্ট দিতে পারেন।
মো. আহসানউল্লাহ, অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ—চুয়েট

অধ্যাপক আহসানউল্লাহ বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এই প্রিন্টার যেন প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এটি হবে বহনযোগ্য, আকারে ছোট এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য। এর সঙ্গে ভয়েস সুবিধা ও কি–বোর্ডের শব্দ যুক্ত করার চিন্তাও ছিল, যাতে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেই লেখা সম্পাদনা করে প্রিন্ট দিতে পারেন।’

অধ্যাপক আহসানউল্লাহ জানান, দেশে ব্রেইল বইয়ের প্রাপ্যতা এখনো সীমিত। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেদারল্যান্ডস সরকারের অনুদানে পাওয়া একটি ব্রেইল প্রিন্টার ছিল। তবে সেটিও আর সচল নেই বলে তিনি জানতে পেরেছেন। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ব্রেইল বই আমদানি করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বই তৈরি করে। সেসব মুদ্রণযন্ত্রের দাম কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্রেইল লেখা বা ছাপানোর সুযোগ বাংলাদেশে একদমই নেই।

লিখলেই ব্রেইলে ছাপা

সিঙ্ক ভি-১ ব্যবহার করা যায় একটি বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে। সফটওয়্যারে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে কোনো লেখা টাইপ করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেইল সংকেতে রূপান্তরিত হয়। এরপর কাগজ প্রিন্টারে প্রবেশ করালে যন্ত্রটি সেই লেখাকে ব্রেইল বিন্দুতে ছাপিয়ে দেয়। ফলে আলাদা করে হাতে ব্রেইল লেখার প্রয়োজন হয় না।

শুধু টাইপ করা লেখা নয়, পিডিএফ, ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ফাইল থেকেও লেখা নিয়ে প্রিন্ট করা যাবে। বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এই সুবিধা রয়েছে। অধ্যাপক আহসানউল্লাহ জানান, সফটওয়্যার উন্নয়ন করা গেলে অন্য ভাষাতেও ব্রেইল প্রিন্টের সুবিধা যুক্ত করা সম্ভব।

বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬–এ ‘সিঙ্ক রোবোটিকস’ দলের হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

প্রচলিত ব্রেইল প্রিন্টারের তুলনায় যন্ত্রটির অন্যতম বিশেষত্ব এর আকার ও বহনযোগ্যতা। একজন ব্যবহারকারী নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী এটি সঙ্গে রাখতে পারবেন। যখন প্রয়োজন হবে, তখনই নিজের মতো করে লেখা ছাপিয়ে নিতে পারবেন।

অধ্যাপক আহসানউল্লাহ বলেন, ‘বিদেশে প্রচলিত ব্রেইল প্রিন্টারগুলোর দাম আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তারও বেশি হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য ছিল, কম খরচে এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা, যা একজন ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারবেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষার উপকরণ সহজলভ্য করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’

ব্যবহারের পর যা বললেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

যন্ত্রটি ইতিমধ্যে ব্যবহার করে দেখেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। তাঁদের একজন সিদ্ধার্থ মিস্ত্রী। প্রচলিত ব্রেইল প্রিন্টারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে লিখতে হতো। আমাদের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে সেভাবে কাজও হয় না। সেই জায়গা থেকে এটি আমাদের জন্য অনেক বড় একটি উদ্ভাবন। প্রচলিত প্রিন্টারের তুলনায় এটি সহজ ও ব্যবহারবান্ধব।’

কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ব্রেইল বই আমদানি করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বই তৈরি করে। সেসব মুদ্রণযন্ত্রের দাম কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্রেইল লেখা বা ছাপানোর সুযোগ বাংলাদেশে একদমই নেই।

অন্য ব্যবহারকারী আকাশ দাসের কাছেও যন্ত্রটির বহনযোগ্যতা ও ব্যবহারিক দিক ভালো লেগেছে। তিনি জানান, ‘ডিভাইসটি ছোট ও হালকা হওয়ায় সহজে বহন করা যায়। এর ব্রেইল ডটগুলোও স্পষ্ট, ফলে পড়তে সুবিধা হয়। তবে আরও কিছু পরিমার্জন করা গেলে এটি আরও কার্যকর হবে।’

জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি

সাশ্রয়ী ব্রেইল প্রিন্টার তৈরির এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ ৩৫৫টি প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘সিঙ্ক ভি-১’। এবারের আয়োজনে জমা পড়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১১৮টি চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য নির্বাচিত হয়। শেষ পর্যন্ত নয়টি প্রকল্পকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। ‘সিঙ্ক ভি-১’ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্টুডেন্ট—টারশিয়ারি, ইনক্লুশন অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিস বিভাগে।

এই স্বীকৃতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের উদ্ভাবন তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে দলটি। চ্যাম্পিয়ন প্রকল্প হিসেবে ‘সিঙ্ক ভি-১’ এপিক্টা অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মনোনীত হয়েছে।

আমাদের হাতে লিখতে হতো। আমাদের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে সেভাবে কাজও হয় না। সেই জায়গা থেকে এটি আমাদের জন্য অনেক বড় একটি উদ্ভাবন। প্রচলিত প্রিন্টারের তুলনায় এটি সহজ ও ব্যবহারবান্ধব।
সিদ্ধার্থ মিস্ত্রী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দলের নেতৃত্বে থাকা সৌরভ তরফদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞান ও উদ্ভাবন শুধু গবেষণাপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নেয় এবং মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। আমাদের এই ব্রেইল প্রিন্টারটিও শুরু হয়েছিল একটি গবেষণা প্রকল্প হিসেবে। এখন আমাদের লক্ষ্য, এটিকে গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং দেশেই তৈরি করা যায়—এমন একটি পণ্য হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’

তাঁর মতে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্রেইল প্রযুক্তি সহজলভ্য করা গেলে শুধু পড়াশোনার সুযোগই বাড়বে না, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথও সহজ হবে। তবে গবেষণার পর্যায় পেরিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে প্রয়োজন সঠিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারী। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের আরও বেশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে চান তাঁরা।

শুধু প্রিন্টার তৈরি করেই থেমে থাকতে চান না উদ্ভাবকেরা। ভবিষ্যতে এর প্রিন্টের গতি বাড়ানো, ওয়্যারলেস সংযোগ যুক্ত করা এবং আরও বেশি ভাষায় ব্যবহারের উপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

অধ্যাপক আহসানউল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রেইলে লেখা ছাপানোর পাশাপাশি একই সঙ্গে সেই লেখার সাধারণ বাংলা বা ইংরেজি অক্ষরও ছাপানোর ব্যবস্থা যুক্ত করা সম্ভব। এতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা নিজেরা ব্রেইলে উত্তর লিখলে এর সাধারণ অক্ষরের সংস্করণও তৈরি হবে। পরীক্ষার সময় অন্য কাউকে দিয়ে উত্তর লিখিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন কমবে।