হাঁকডাক দরদামে জমজমাট শতবর্ষী মাছের মেলা

গাজীপুরের কালীগঞ্জে শতবর্ষী জামাই ও মাছের মেলায় উৎসবের আমেজ। বর্ণিল সাজে জামাই সেজে মেলায় হাজির হয়ে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়লেন এক যুবক। বুধবার বিকেলেছবি: প্রথম আলো

পৌষসংক্রান্তি এলেই গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে প্রাণ ফিরে পায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটির বাস্তব রূপ যেন এ আয়োজন। শুধু মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক দিনের এ মেলা এখন আর কেনাবেচার জন্য নয়; মেলাটি স্থানীয় মানুষের আনন্দ, উৎসব ও মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

বুধবার সকালে মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে মানুষের স্রোত। গ্রামের শুকিয়ে যাওয়া বিলের পাড় ঘিরে সারি সারি দোকান, হাঁকডাক আর দরদামের শব্দে মুখর চারপাশ। এখানেই প্রতিবছরের মতো বসেছে আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। মেলাটি সর্ববৃহৎ ও ব্যতিক্রমধর্মী মাছের মেলা হিসেবে পরিচিত। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এ আয়োজন আজও মানুষের আবেগ, প্রতিযোগিতা আর উৎসবের রং ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এলাকাবাসী, আয়োজক ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলো জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত থেকেই মেলায় মাছ আসতে শুরু করে। ট্রাক, পিকআপ, নৌকা আর ভ্যানে করে আনা হয় দেশি-বিদেশি নানা জাতের মাছ। স্টলে সাজানো থাকে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, বোয়াল, বাগাড়, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্পসহ বাহারি মাছ। ছোট মাছ থেকে শুরু করে ৩০ থেকে ৪০ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির মাছ মেলায় দেখা যায়। দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ কাড়ে বিশাল আকারের মাছগুলো। এ বছর মেলায় আলোচনার কেন্দ্রে ছিল প্রায় ৮০ কেজি ওজনের একটি সামুদ্রিক পাখি মাছ। পাশাপাশি সামুদ্রিক চিতল, রুপচাঁদা, গলদা চিংড়ি ছাড়াও পাবদা, গুলশা, বাইমসহ দেশি ও সামুদ্রিক মাছের সমাহার চোখে পড়ে।

বিনিরাইলের এই জামাই মেলার মূল বৈশিষ্ট্য মাছ কেনাকে ঘিরে একধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা। কোন জামাই কত বড় মাছ কিনলেন, তা নিয়ে চলে আলোচনা। শ্বশুরবাড়িতে সম্মান আর সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেই বড় মাছ কেনার এই প্রচলন গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয় মানুষেরা জানিয়েছেন।

কালীগঞ্জে শতবর্ষী মাছের মেলা থেকে বড় একটি মাছ কিনেছেন এক ব্যক্তি। বুধবার বিকেলে
ছবি: প্রথম আলো

মেলায় আসা মোক্তারপুর গ্রামের জামাই হালিম মোল্লা বলেন, ‘বছরের এই একটি দিনের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নিই। সারা বছর ব্যস্ততার কারণে শ্বশুরবাড়িতে আসতে না পারলেও এই মাছের মেলাকে কেন্দ্র করে এক দিন আগেই শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসি। চার বছর ধরে মাছের মেলা থেকে বড় আকারের মাছ কেনার চেষ্টা করি। এ বছর বড়-ছোট মিলিয়ে ৭৫ হাজার টাকার মাছ কিনেছি।’

মেলার জনপ্রিয়তা এখন শুধু কালীগঞ্জ বা গাজীপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে মানুষ বিশেষভাবে এই মেলা উপলক্ষে বিনিরাইলে আসেন। কেউ মাছ কিনতে, কেউ আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে আবার কেউ শুধুই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উপভোগ করতে আসেন।

কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে মাছের মেলার কথা শুনে আসতে চাই, কিন্তু আসা হয়নি। এ বছর পরিবারসহ মেলা দেখতে এসেছি। কিছু মাছও কিনেছি।’

বিনিরাইল গ্রামের কৃষক খাইরুল ইসলাম বলেন, বছরের অন্য কোনো দিনে গ্রামে এত মানুষের সমাগম দেখা যায় না। এক দিনের মেলায় পুরো এলাকাকে পরিণত করে মানুষের মিলনমেলায়। মেলায় শুধু মাছ নয়; আসবাব, খেলনা, মিষ্টি, শিশুদের নানা সামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানও বসে। ফলে পুরো পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জন্য মেলাটি হয়ে ওঠে গ্রামীণ উৎসবে।

মেলার জনপ্রিয়তা এখন শুধু কালীগঞ্জ বা গাজীপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে মানুষ বিশেষভাবে এ মেলা উপলক্ষে বিনিরাইলে আসেন। বুধবার বিকেলে
ছবি: প্রথম আলো

আয়োজকেরা জানান, প্রায় আড়াই শ বছর আগে স্থানীয়ভাবে জামাইদের সম্মান জানাতে এ মেলা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার আকার, মাছের বৈচিত্র্য ও মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে মূল বিষয় ছিল জামাইকে কেন্দ্র করে মাছের মেলা। জামাই মেলা আজ শুধু একটি মাছের বাজার নয়। এটি গ্রামীণ সমাজের সম্পর্ক, মর্যাদা ও উৎসবের এক অনন্য দলিল।

কিশোরগঞ্জের মাছ বিক্রেতা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘এই মেলার জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। জামাইরা বড় মাছ নিতে চান। তাই আমরা, বিশেষ করে বড় সাইজের মাছ নিয়ে আসি। এক দিনেই ভালো বিক্রি হয়ে যায়।’ আরেক বিক্রেতা কার্তিক দাস বলেন, এখানে দরদাম হলেও শেষ পর্যন্ত সবাই কিনে নেয়। কারণ, জামাই মেলায় মাছ না কিনে কেউ ফিরতে চান না। বড় মাছগুলোর চাহিদাই বেশি।

কালীগঞ্জ পৌর এলাকা থেকে আসা স্থানীয় চুপাইর গ্রামের জামাই মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, এই মেলা শুধু কেনাবেচা নয়, সম্পর্কের টান। বহু বছর ধরে নিয়ম করেই এখানে আসেন। এখন এটি সবার উৎসব।

আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, প্রায় আড়াই শ বছর ধরে এই জামাই মেলা চলে আসছে। সময় বদলেছে। কিন্তু ঐতিহ্য বদলায়নি। প্রতিবছরই মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, যা তাঁদের অনুপ্রাণিত করে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিনিরাইলের মাছের মেলা স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। এমন আয়োজন আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে। মেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকমের সহযোগিতা করা হয়েছে।’