‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন, সুপারহিরো হয়ে থাকবেন’

দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। শুক্রবার নেত্রকোনোর দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায়ছবি: প্রথম আলো

‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন। তাঁকে কে কীভাবে মূল্যায়ন করত, তা জানি না। তবে তিনি আমার কাছে সব সময়ই সুপারহিরো হয়ে থাকবেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাঁর স্মৃতি কখনো ভুলতে পারব না।’

স্বামী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে হারিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন আলিফ।

বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন আলিফ। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন। আলিফ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। থাকতেন তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে।

বিয়ের পর থেকে একটা রাতও আমাকে ছাড়া তিনি (লুৎফুজ্জামান আলিফ) থাকতে পারতেন না। প্রতিদিন আমার মুখে ভাত তুলে দিতেন। আমি নিজের হাতে খেতাম না, তাঁর হাতে খেতাম। আমার পড়ালেখার পেছনেও তাঁর অবদান আছে। আমি নার্সিং পাস করেছি। তিনি আমার চাকরিরও ব্যবস্থা করছিলেন।
আনন্দিতা সাংমা, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফের স্ত্রী
স্বামী লুৎফুজ্জামান আলিফের সঙ্গে আনন্দিতা সাংমার এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি রুলি রেমা বলেন, ‘আমাদের মেয়ের জামাই খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমরা গারো, আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন এবং তিনিও গারো সম্প্রদায়ের মানুষদের খুব পছন্দ করতেন। এই মানুষটাকে আমাদের এলাকায় মেরে ফেলা হলো এই কষ্ট আমরা কোনো সময় বুলতে পারব না।’

লুৎফুজ্জামানের শাশুড়ি শিলা রাংসাও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। তাঁর ভাথ্য, দুর্গাপুরে গত কয়েক বছরে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কেউ বিচার পেল না। এর আগে সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর নামের একজনকে হত্যা করা হয়েছে, দুর্গাপুর বাজারে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে, আদিবাসী নেতা কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমাকে হত্যা করা হলো। আজ পর্যন্ত কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি।

শিলা রাংসা বলেন, ‘এবার আমার মেয়ের জামাতাকে এতগুলো গুলি করে মেরে ফেলল। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে? আমিও তো গরিব।’

স্বজনরা জানান, এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। ঘটনা আলিফ বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত রয়েছে।

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির
ছবি: সংগৃহীত

‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখত, অনেক শত্রু হয়েছিল’

লুৎফুজ্জামান আলিফের চাচাশ্বশুর বিশু সাংমা জানালেন, ঘটনার সময় তাঁরা বাড়ির বাইরে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে চায়ের দোকানের কাছে গিয়ে আলিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি বলেন, ‘শুনছি, দুজন গুলি করছে আর দুজন কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা সবাই এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা চলে গেছে।’

কথা হয় আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকিরের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁরা তিন ভাই ও চার বোন। আলিফ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিনি বাড়িতে ছিলেন। পরে দুর্গাপুরে আদিবাসী নারী আনন্দিদা সাংমাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। তবে বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

শহীদ ইসলাম বলেন, ‘সাংবাদিকতা করার কারণে আমার ভাইয়ের অনেক শত্রু হয়েছিল। যাঁরা তাঁকে এতগুলো গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

আরও পড়ুন

ময়নাতদন্ত ও মামলা

আলিফ হত্যার ঘটনায় দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। গতকাল রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার করা হত্যা মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান। আজ শনিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গতকাল বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে লুৎফুজ্জামানের মরদেহ দাফন করা হয়।

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের নিথর দেহের পাশে কাঁদছেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় তেলনজিয়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো
আরও পড়ুন

গতকাল শুক্রবার দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর স্মৃতি হাতড়ে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে কাঁদছিলেন আনন্দিতা। তাঁর পাশে বসে চোখের পানি মুছছিলেন মা শিলা রাংসা ও দুই ফুফু নিরালা রেমা ও রুলি রেমা। হঠাৎ স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে কীভাবে চলবেন, সেই দুশ্চিন্তার কথাও জানাচ্ছিলেন আনন্দিতা।

কাঁদতে কাঁদতে আনন্দিতা বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে একটা রাতও আমাকে ছাড়া তিনি (লুৎফুজ্জামান আলিফ) থাকতে পারতেন না। প্রতিদিন আমার মুখে ভাত তুলে দিতেন। আমি নিজের হাতে খেতাম না, তাঁর হাতে খেতাম। আমার পড়ালেখার পেছনেও তাঁর অবদান আছে। আমি নার্সিং পাস করেছি। তিনি আমার চাকরিরও ব্যবস্থা করছিলেন। বলছিলেন, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে আমরা এখান থেকে চলে যাব। আমাদের দুটি ছোট বাচ্চা। এখন আমি তাদের নিয়ে কীভাবে থাকব? আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমি তাদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

তেলনজিয়ায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, চায়ের দোকানের সামনে যেখানে আলিফকে গুলি করা হয়েছিল, সেখানে রক্তের দাগ শুকিয়ে আছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। সেখানে একটি টিনের ঘরের সামনে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে কাঁদছিলেন আনন্দিতা। পাশে বসে তাঁর মা ও দুই ফুফু তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আরও পড়ুন

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ সাংবাদিকদের জানান, লুৎফুজ্জামানের বুকে তিনটি গুলির আঘাত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। অন্যটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। ক্ষতের ধরন বিশ্লেষণ করে ওই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, আলিফকে সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল।