পদোন্নতির সমস্যা সমাধানে উপাচার্যকে পাঁচ দিনের সময় দিলেন ৬০ শিক্ষক

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ছবি: প্রথম আলো

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা শিক্ষকদের পদোন্নতিপ্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার জন্য তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশেষ করে উপাচার্যের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকেরা উপাচার্যকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার রাতে উপাচার্যের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে এক চিঠির মাধ্যমে এই সময়সীমা বেঁধে দেন শিক্ষকেরা। পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০ জন শিক্ষক প্রশাসনিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে আজ শনিবার দুপুরে প্রথম আলোকে উপাচার্য মো. তৌফিক আলম বলেন, ‘এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো গাফিলতি নেই। এটা নীতিমালার বিষয়। যা করতে হবে, তা নীতিমালার মধ্যে থেকেই করতে হবে।’

আমরা গত ৭ থেকে ৮ মাসে অন্তত ৩০ বার উপাচার্যের সঙ্গে বসেছি। অনেক অনুরোধ করেছি, যাতে আমাদের পদোন্নতি ঝুলিয়ে না রাখা হয়। প্রতিবারই তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এটাকে কীভাবে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলা যায়, সেই চেষ্টা করেছেন।
আবদুল কাইয়ুম, সহযোগী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ

পদোন্নতিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের মধ্যে আছেন ২৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৩০ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ৬ জন প্রভাষক। তাঁদের ভাষ্য, পদোন্নতি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং যোগ্য শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার। বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব পাওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে পদোন্নতি বোর্ড গঠন করেন। এর পর দুটি সিন্ডিকেট সভা হলেও উপাচার্য নিয়োগ বোর্ড অনুমোদনের প্রস্তাবনা সিন্ডিকেটে তোলেননি। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ সিন্ডিকেট সভা হয়। ওই সভার আগে পদোন্নতিপ্রত্যাশী শিক্ষকেরা পদোন্নতি বোর্ড অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেট সভায় তোলার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে অনুরোধ করলেও উপাচার্য তা রাখেননি।

শিক্ষকেরা জানান, একজন শিক্ষকের অধ্যাপক হতে পিএইচডিসহ ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু যে ২৪ জন সহযোগী অধ্যাপক রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের ১৫ থেকে ১৬ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাকি ৩৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩০ জন সহযোগী অধ্যাপক এবং ৬ জন সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতির শর্ত অনেক আগেই পূরণ করেছেন। এরপরও তাঁদের পদোন্নতি আটকে আছে।

মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গত ৭ থেকে ৮ মাসে অন্তত ৩০ বার উপাচার্যের সঙ্গে বসেছি। অনেক অনুরোধ করেছি, যাতে আমাদের পদোন্নতি ঝুলিয়ে না রাখা হয়। প্রতিবারই তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এটাকে কীভাবে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলা যায়, সেই চেষ্টা করেছেন।’

পদোন্নতিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের পক্ষে গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাদেকুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠি উপাচার্যের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি বিভাগের ২৪ শিক্ষকের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য সিলেকশন বোর্ড গত বছরের ১ নভেম্বর সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হলেও গত সাড়ে পাঁচ মাসে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এভাবে অধ্যাপকসহ অন্যান্য পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া বন্ধ থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত। পদোন্নতি না পাওয়ায় অনেক শিক্ষকের ‘ইনক্রিমেন্ট’ হচ্ছে না, তাঁরা গবেষণায় মনোনিবেশ করতে পারছেন না। শিক্ষকেরা মানসিকভাবে অসহায় ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

অভিন্ন নীতিমালা দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় অভিযোজন করেছে। যে তিনটি করেনি, তার মধ্যে বরিশাল বিদ্যালয় রয়েছে। আমরা সেটি অভিযোজন করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ করছি। এটা হয়ে গেলে তাঁরা যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি পাবেন।
মো. তৌফিক আলম, উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

পদোন্নতিপ্রত্যাশী সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক মোস্তাকিম রহমান বলেন, ‘আমরা বারবার উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে সমস্যার সমাধান চেয়েছি। তিনি বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়নি। এমনকি কর্মদিবসেও দেখা করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। পরে তিনি সময় দিলে আমরা বৈঠকে উপস্থিত হয়ে চিঠি প্রদান করেছি। এখন দেখার বিষয়, তিনি আমাদের জন্য কী করেন।’

প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পরও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ২১১ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে প্রায় ১৫০টি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬১ জন আছেন শিক্ষাছুটিতে। এর ফলে পাঠদান চলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

শিক্ষকেরা বলছেন, একটি বিষয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষক প্রয়োজন। সে অনুযায়ী ২৫টি বিভাগে অন্তত ৫০০ শিক্ষক প্রয়োজন। সেখানে বর্তমানে ১৫০ জন (শিক্ষাছুটি বাদে) শিক্ষক দিয়ে ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হচ্ছে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার গুণগত মান যেমন বৃদ্ধি পায় না, তেমনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাপকেরা সাধারণত অ্যাডভান্সড কোর্স পড়ান এবং নতুন কারিকুলাম ডিজাইন করেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক না থাকায় কোর্সগুলো অনেক সময় শুধু পাস করানোর মতো হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের যে গভীরতা দরকার, তা কমে যায়। এ ছাড়া অধ্যাপকসংকট থাকলে একইভাবে একাডেমিক নেতৃত্বে দুর্বলতা দেখা দেয়, আন্তর্জাতিক সংযোগ ও সুযোগ কমে যায়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. তৌফিক আলম জানান, যে নিয়মে শিক্ষকেরা পদোন্নতি চাচ্ছেন, তাতে ইউজিসির আপত্তি আছে। ইউজিসি বলেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিন্ন নীতিমালায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে হবে। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত পত্র দিয়েছে ইউজিসি। তিনি বলেন, ‘অভিন্ন নীতিমালা দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় অভিযোজন করেছে। যে তিনটি করেনি, তার মধ্যে বরিশাল বিদ্যালয় রয়েছে। আমরা সেটি অভিযোজন করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ করছি। এটা হয়ে গেলে তাঁরা যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি পাবেন।’

পদোন্নোতিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের চিঠি প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষকদের সঙ্গে গতকাল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই আমরা একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারব।’