চাঁদা তোলা নিয়ে বিএনপিপন্থী দলিল লেখক বললেন, ‘নিউজ করলে ভালো থাকবেন না’

বাঘা সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীর বাঘা সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ‘কল্যাণ তহবিল’-এর নামে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গত সপ্তাহ থেকে এই অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক দলিল লেখক। তাঁদের অভিযোগ, বিএনপিপন্থী দুই দলিল লেখকের নেতৃত্বে এই অর্থ তোলা হচ্ছে।

সাধারণ দলিল লেখকেরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলিল লেখকদের সমিতি ছিল। এই সমিতির নামে সরকারি ফি বাদেও যত লাখ টাকার দলিল হতো তার প্রথম লাখে ৩ হাজার টাকা, পরবর্তী লাখে ২ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হতো। এই নিয়মে একজন ক্রেতা যদি ৫০ লাখ টাকার দলিল করতেন, তাহলে তাঁকে সরকারি ফি বাদ দিয়েই বাড়তি ৫০ হাজার টাকা সমিতির জন্য দিতে হতো। দলিল লেখক সমিতিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের একজন নেতাও খুন হন।

আওয়ামী লীগের সময় তো আরও বেশি চাঁদা নিয়েছে। তখন তো আপনারা (সাংবাদিকেরা) কিছু করতে পারেননি।
শাহীন মণ্ডল, বিএনপিপন্থী দলিল লেখক

সরকার পতনের পর বিএনপি নেতারা একই কাজ শুরু করলে প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়। গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে কল্যাণ তহবিলের নামে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা নেওয়া শুরু হয়েছে। সাধারণ দলিল লেখকেরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে আবার আগের সমিতি ফিরে আসবে।

একাধিক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মন থেকে কেউ চাঁদা দিতে চান না। বিএনপিপন্থী দুই দলিল লেখক এই উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন কেউ তাঁদের ওপর দিয়ে কথা বলতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

বাঘা সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে প্রায় পৌনে ২০০ লাইসেন্সধারী দলিল লেখক রয়েছেন। সপ্তাহে দুই দিন অফিস চলে। গড়ে দিনে ৩০টি করে দলিল হয়। এতে একজন দলিল লেখক সপ্তাহে একটা কাজ পান। আবার কেউ কোনো কাজ পান না। এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ পর একটা দলিল পেলে তাঁর লেখার সম্মানী থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দেওয়া কঠিন। বাধ্য হয়ে দলিল লেখকেরা যাঁরা দলিল করতে আসবেন, তাঁদের কাছ থেকেই এই বাড়তি টাকা আদায় করবেন।

কল্যাণ তহবিলের নামে যে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপিপন্থী দলিল লেখক শাহীন মণ্ডল ও মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে শাহীন মণ্ডল গতকাল রোববার এই প্রতিবেদককে বলেন, একজন দলিল লেখক মারা গেছেন। তাঁর পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সব দলিল লেখক একমত হয়ে একটা রেজোল্যুশন করে এই টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনজন দলিল লেখকের নামে ব্যাংকে হিসাব নম্বর খোলা হয়েছে। টাকা সেখানেই জমা রাখা হচ্ছে। এই সমিতির চাঁদা দেওয়ার জন্য দলিল লেখকেরা জনগণের কাছ থেকে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকার বেশি আদায় করবেন।

জনগণ কেন এই বাড়তি টাকা দেবে, জানতে চাইলে শাহীন মণ্ডল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় তো আরও বেশি চাঁদা নিয়েছে। তখন তো আপনারা (সাংবাদিকেরা) কিছু করতে পারেননি।’ একপর্যায়ে হুমকির সুরে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে কোনো নিউজ করলে আপনিও ভালো থাকবেন না।’

কল্যাণ তহবিলের নামে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে বাঘা সাবরেজিস্ট্রার এন এম নকিবুল আলম দাবি করেন, বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি। কোনো দলিল লেখক অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ দলিল লেখকদের এই সমিতি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এবার কল্যাণ সমিতির নামে চাঁদা তোলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তিনি সব সময় চাঁদা তোলার বিপক্ষে, এই কাজ করতে দেবেন না