অক্টোবর মাসের এ সময়ে খেতখামারে সেচের চাহিদা খুব একটা থাকে না। আর এ সুযোগে খুলে দেওয়া হয় বাঁধের দরজা। ধীরে ধীরে পানি কমতে থাকে। আর এ সময়ে শুরু হয় মাছ ধরার উৎসব। আশপাশের গ্রামের মানুষ ফিকা জাল, খইয়া জাল নিয়ে মেতে ওঠেন মাছ ধরার উৎসবে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন শহরের মানুষজনও। কেউ একটা বড় মাছ ধরতে পারলেই চিৎকার-চেঁচামেচি করে সবাইকে জানান দেন। এ উৎসব চলে দুই থেকে তিন দিন। কিন্তু এবার আশানুরূপ মাছ না পেয়ে হতাশা নিয়ে ফিরেছেন অনেকেই।

সদর উপজেলার বকশের বাজার এলাকার শিক্ষার্থী সোহরাব হোসেন এসেছেন মাছ ধরতে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা বন্ধুরা মিলে এই সময় বাঁধের পানিতে মাছ ধরতে আসি। হইহুল্লোড় করে সারা দিন কাটিয়ে দিই। বাড়িতে ফেরার সময় কিছু মাছও নিয়ে যাই।’

পুরোনো ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমজান আলী (৫৩) মাছ ধরতে এসেছেন। কখনো তিনি বাঁধের ওপর, আবার কখনো পানিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক জাল ফেলতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁর জালে মাছ ধরা দিল না। সকাল নয়টার দিকে জাল ফেলার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘আগে রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি, মলা-ঢেলা, গুতুম, শোল, ট্যাংরা, খলসে, টাকিসহ অনেক মাছ পেতাম। এখন জালে মাছ পড়ছে কম। তিন ঘণ্টায় কেবল কয়েকটা ছোট মাছ পেয়েছি। তবে হাল ছেড়ে দিইনি। আমার জন্য হয়তো বড় রুই-কাতলা অপেক্ষা করছে!’

হঠাৎ হইচই শুরু হলো। পঞ্চগড়ের বোদা পৌর এলাকার জুয়েল ইসলামের (৩২) জালে রুই ধরা পড়ায় এ উল্লাস। মাছটির ওজন দেড় কেজির মতো। বাঁধের পানিতে মাছ ধরতে এসে একটি শোল আর কয়েকটি ছোট মাছ পেয়েছেন নারগুন এলাকার মো. বুলবুল (৩৫)। একটানা আধা ঘণ্টা জাল ফেলে হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি। তাই সহযোগীদের নিয়ে বিশ্রাম করতে বসেন তিনি। একসময় একজন গান ধরলেন, ‘ইলিশ মাছের ত্রিশ কাঁটা, বোয়াল মাছের দাড়ি; বৈশাখ মাসের এক তারিখে, আইসো আমার বাড়ি।’

সেই গান শেষ না হতেই পানিতে দাঁড়িয়ে ‘এলে পরে বন্যার জল, বাড়ে মাছের দ্বিগুণ বল; মাছে-মাছে কোলাহল, বিবাদ গুরুতর’ গান গাইতে থাকেন মাধবপুরের জ্যোতি বর্মণ (৫১)। এ গানের সঙ্গে অনেকেই কণ্ঠ মেলালেন। গান শেষ হতেই তিনি বললেন, ‘মাছ পাও আর না পাও তাতে কী, আনন্দখান তো হচে!’

পরপর ছয়বার জাল ফেলে একটি মাছও পাননি ঠাকুরগাঁও সদরের ফাড়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা তসলিম উদ্দিন (২৮)। সপ্তমবারে তাঁর জালে একটি টাকি মাছ ধরা পড়ল। ব্যাগে মাছটি রাখতে রাখতে তিনি বলেন, ‘বউনি করিতেই শরীরের শক্তিখান শেষ, অ্যালা রিচার্জ করিবা হবে’ বলেই একটা পোঁটলা থেকে ভাত, ডিম ও সবজি বের করে খেতে বসে গেলেন তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচসুবিধার জন্য ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নে ১৯৫১ সালে বুড়ির বাঁধ সেচ প্রকল্প হাতে নেয় পাউবো। ১৯৭৭-১৯৭৮ সালে সেচ খাল নির্মাণ করা হয়। এর পর থেকে বাঁধে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর বর্ষাকালে বিভিন্ন জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ছাড়ে মৎস্য বিভাগ। আর এটা দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ। এরপর অক্টোবর মাসের এ সময় বাঁধের পানি ছেড়ে দিয়ে সবার জন্য মাছ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। জলকপাট নির্মাণের পর থেকেই উৎসবের এ রেওয়াজ চলে আসছে।