ঠাকুরগাঁওয়ে রাষ্ট্রপতিকে সংবর্ধনা; বললেন, আপনাদের ভালোবাসার ঋণ শোধ করার নয়
ঠাকুরগাঁওয়ে নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা শোধ করতে পারব না। এই ঋণ শোধ করার নয়।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রথম ঠাকুরগাঁও সফরে এসেছেন। তিনি আজ রোববার বেলা একটায় দুই দিনের সরকারি সফরে ঠাকুরগাঁও পৌঁছান। বিকেলে তাঁকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় বড়মাঠে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বেলা সাড়ে তিনটায় তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় সংবর্ধনা মঞ্চে এসে পৌঁছান। এ সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম সঙ্গে ছিলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পৌঁছালে উপস্থিত জনগণ তাঁকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। এ সময় তিনি দুই হাত তুলে তাঁদের জবাব দেন।
ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের সঞ্চালনায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা ও বাইবেল পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। এরপর রাষ্ট্রপতির জীবন নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র ‘শিকড় থেকে শিখরে’ পরিবেশন করা হয়। প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর পর চলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
অনুষ্ঠানে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু,পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর–১ আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও–২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুুস সালাম, ঠাকুরগাঁও–৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান, জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে, ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শঙ্কর কুমার ঘোষ, শিক্ষক হাফেজ আব্দুর রশিদ, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি আরতি মার্ডি, আখচাষি ইউনুস আলী প্রমুখ বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বরাবরই পিছিয়ে পড়া। এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। তাঁরা ঠিকমতো নিজেদের চাওয়ার কথাও বলতে পারেন না। তবে মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা তিনি করে গেছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি যখনই আপনাদের কাছে এসেছি, আপনারা আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমি চেষ্টা করেছি সেই আস্থার মূল্য দিতে। আমরা আর রক্তপাত চাই না।’ ঠাকুরগাঁওকে শান্তিপূর্ণ এলাকা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এখানকার মানুষ ঝামেলা পছন্দ করেন না। এই পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা ও বাইবেল পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। এরপর রাষ্ট্রপতির জীবন নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র ‘শিকড় থেকে শিখরে’ পরিবেশন করা হয়। প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর পর চলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস সহিষ্ণুতা
সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, নিজেদের মতবাদ প্রচার করবেন; কিন্তু সংঘাতের মধ্যে জড়াবেন না। আমরা আর রক্তপাত চাই না।’ রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস সহিষ্ণুতা। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ থাকবে—কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়। আসুন, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে এসে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও ছিল। জমি হয়ে গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমাদের সামনে বসে আছেন। মেডিক্যাল কলেজের কথা বলেছিলেন, সেটাও হয়েছে।’ ভুল্লি ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবির কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, দুটি আলাদা উপজেলা করার দাবি ছিল, দুটিই হয়ে গেছে।’ ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিমানবন্দর চালু করতে হলে এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করার কথাও জানান তিনি।
হবে স্পোর্টস ভিলেজ, তথ্য কমপ্লেক্স
ঠাকুরগাঁওয়ে মাদ্রাসা, স্কুল ও কলেজের উন্নয়নের পাশাপাশি একটি স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার কথা জানান রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় ও আঞ্চলিক সমবায় ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। বিমানবন্দরও চালু করার কথা জানান।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা কাজ করতে চাই। যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সঙ্গে থাকতে চাই। যাঁরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন, তাঁদের সমর্থন জোগাতে চাই।’
তরুণদের মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। মাদক বর্জন করো। মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁওকে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করো।’
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা আমাকে ধাক্কা মেরে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগটা কমে গেল।’
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা আমাকে ধাক্কা মেরে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগটা কমে গেল।’ তবে ঠাকুরগাঁওবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যখনই চাইবেন যোগাযোগ করবেন। আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আমি করব। আপনারা কেউ ভাববেন না যে আমি আপনাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি বা আপনারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আপনাদের সঙ্গেই থাকব।’
বক্তব্যদের শেষে নিজের রাজনৈতিক জীবনে ঠাকুরগাঁওবাসীর ভালোবাসার কথা স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা যেন আমাকে সেই তৌফিক দেন, জীবনের বিনিময় হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি। দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি।’