রোজ ভোরে তাঁরা শ্রম বিক্রি করতে আসেন

প্রতিদিন সাতসকালে দলে দলে মানুষ বাঁশের ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন সিলেট নগরের কয়েকটি স্থানে। গতকাল সকালে নগরের আম্বরখানা মোড়ে
ছবি: প্রথম আলো

পরনে জীর্ণ কাপড়। রোদে পুড়ে শরীর তামাটে হয়ে গেছে। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। সিলেটের আম্বরখানা মোড়ের বন্ধ একটি দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন আবদুল মতিন ও মছব্বির আলী। তাঁদের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ছয় মাস হলো কাজের সন্ধানে তাঁরা দুজন সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট নগরে এসেছেন। মতিন ও মছব্বির দুজনেই রাজমিস্ত্রির জোগালি ও গাছগাছালির ডালপালা পরিষ্কারের কাজ করেন। কাজের অপেক্ষায় তাঁরা সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে এ রকম দলে দলে মানুষ বাঁশের ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন সিলেট নগরের কয়েকটি স্থানে। পেটের তাগিদে তাঁরা নিজের শ্রম বিক্রি করতে আসেন। সকালের মধ্যে পছন্দমতো কাজ পেয়ে গেলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। তবে কাজ না পেলে মলিন মুখে শূন্য হাতে বাড়িতে ফিরতে হয়। সিলেট নগরের মদিনা মার্কেট, আম্বরখানা, বন্দরবাজার, জেলরোড ও শিবগঞ্জ এলাকায় প্রতিদিন এমন চিত্র দেখা যায়।

গতকাল সোমবার সকাল সাতটার দিকে মতিন ও মছব্বিরের সঙ্গে কথা হয়। মছব্বির বলেন, কাজের সন্ধানে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তাঁরা। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার ও বাসাবাড়ির মালিকেরা তাঁদের কাজে নিতে আসেন। তবে বর্তমানে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে আর কাজ কমেছে। তাই প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। বর্তমানে কাজ কম থাকায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হয়। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় তাঁদের শ্রমের মজুরি বাড়েনি। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন কাজ পান। ওই উপার্জন দিয়েই সংসারের সব খরচ মেটাতে হয়।

মছব্বিরকে থামিয়ে মতিন কথা বলা শুরু করলেন। মতিন জানালেন, তাঁদের বাড়ি একই গ্রামে। একসময় তাঁদের ফসলি জমি ছিল। এলাকায় কাজও পাওয়া যেত। খেতের ধান আর টুকটাক উপার্জন দিয়ে ভালোভাবেই বছর চলে যেত। এখন প্রায় প্রতিবছরই বন্যা হচ্ছে। বন্যা হলেই ফসল নষ্ট হয়। এলাকায় তখন কাজও পাওয়া যায় না। বাঁচার তাগিদেই গ্রাম ছেড়ে তাঁরা কাজের সন্ধানে শহরে এসেছেন।

আলাপের ফাঁকে দেখা গেল, বড়বাজার এলাকার কয়েছ মিয়া নামের এক ব্যক্তি বাসার ছাদ ঢালাইয়ের মাল বহনের জন্য পাঁচজন শ্রমিক নিতে এসেছেন। তাঁকে দেখেই শ্রমিকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। সবাই কাজে যেতে প্রস্তুত। এ জটলার পাশেই সাদ মিয়া (৬৫) ও মনা বিবি (৫৫) বসে আছেন। সাদ মিয়া বলেন, ‘বয়স বেশি হওয়ায় অনেকেই আমাকে কাজে নিতে চায় না। যিনি কাজে নিতে এসেছেন, তিনি এর আগেও আমার বয়স বেশি মনে করে কাজে নেননি। কিন্তু অন্য যুবক থেকেও আমি ভালো কাজ করতে পারি।’

কাজের অপেক্ষায় বসে আছেন মনা বিবি
ছবি: প্রথম আলো

পাশে বসে থাকা মনা বিবির বাড়ি হবিগঞ্জে। স্বামী মারা যাওয়ার পর চার বছর ধরে তিনি সিলেট শহরে থাকেন। বাড়িতে স্বামীর ফসলি জমি ছিল। সেগুলোতে ধান ও সবজি ফলিয়ে সংসার চলত। ছেলেরা জমি ও বাড়ি বিক্রি করে তাঁকে ছেড়ে ঢাকা চলে গেছে। তিনি বলেন, ‘শুনছি সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা দেয়। কিন্তু আমাকে তো কেউ এই ভাতা দেয় না।’

আরও কয়েকজন দিনমজুর তখন আলাপে যোগ দিলেন। এর মধ্যে আহাদ ও রহিম একসময় পাথর কোয়ারিতে কাজ করতেন। বর্তমানে কোয়ারি বন্ধ থাকায় তাঁরা এক বছর ধরে সিলেট শহরে এসে শ্রমিকের কাজ করছেন। আহাদ বলেন, তিনি দুই দিন ধরে কাজ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আজ কাজে যেতে না পারলে পরিবারের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।

আহাদের কথা শেষ হতেই রহিম বলেন, ‘৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি। তারপর সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন কাজ পাওয়া যায়। এ টাকা দিয়ে কি আর পুরো সপ্তাহ পেট ভরে খাওয়া যায়! সবকিছুরই দাম বাড়ে, শুধু আমাদের মতো গরিব মানুষের কাজের দাম বাড়ে না।’

শ্রমিক খুঁজতে আসা কয়েছ মিয়া বলেন, ছাদ ঢালাইয়ের মাল বহনের কাজে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়। সবাই এই কাজ পারেন না। তাই তিনি যুবক ও তরুণ বয়সের পাঁচজনকে নিচ্ছেন। এই পাঁচজনের প্রত্যেককে তিনি ৬০০ টাকা করে মজুরি দেবেন।