জ্বালানিসংকটে কমেছে ট্রিপ, থমকে গেছে ট্রাকচালক রাজুর জীবনের চাকা

রংপুর থেকে কুমিল্লার নিমসার কাঁচাবাজারে আলুবোঝাই ট্রাক নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ রাজু। তেলসংকটে তাঁর চোখেমুখে হতাশার ছাপ। বুধবার দুপুরে নিমসার বাজারেছবি : প্রথম আলো

আট বছর চালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করার পর প্রায় সাত বছর ধরে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছেন ট্রাকচালক মোহাম্মদ রাজু। এই সাত বছরে রাজু দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহন করে চলেছেন। তবে রাজুর মুখে এখন ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট। বর্তমান জ্বালানিসংকট ট্রাকের চাকার সঙ্গে রাজুর জীবনের গতিও যেন থমকে দিচ্ছে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজুর সঙ্গে বুধবার দুপুরে কথা হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁচাবাজার কুমিল্লার নিমসারে। তিনি রংপুর থেকে আলু নিয়ে এখানে এসেছেন। জ্বালানি তেলের প্রসঙ্গ উঠতেই রাজু বললেন, ‘এই তেলসংকট আমগো মুখের হাসি কাইড়া নিছে। এখন আমগো পেটে লাথি মারার অবস্থা।’

রাজু জানান, জ্বালানিসংকট তাঁর মতো হাজারো ট্রাকচালকের জীবনের ছন্দ বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে সপ্তাহে তিন থেকে চারটি ট্রিপ দিতে পারতেন, এখন জ্বালানির অভাবে তা এক-দুটিতে নেমে এসেছে। কখনো আবার তেল না পেলে টানা কয়েক দিন ট্রাক নিয়েই বসে থাকতে হয়। এতে তাঁদের অর্ধেকের বেশি আয় কমে গেছে। কিন্তু সংসারের খরচ কমেনি; বরং বেড়েছে।

ট্রাকচালক মোহাম্মদ রাজু বলেন, ‘আমাদের এলাকার কাছাকাছি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাটে একটি ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য প্রায় আড়াই দিন বসে ছিলাম। একটু দূরে কোথাও গিয়ে ডিজেল নেব, সেই তেলটুকুও ছিল না। তেলের অপেক্ষায় ওই পাম্পের মিটারের সামনে ট্রাক রেখে দিয়েছিলাম। অবশেষে গত সোমবার ১০০ লিটার তেল পেয়েছি। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় রংপুর থেকে আলু নিয়ে রওনা দিয়েছি ঢাকার উদ্দেশে। পথে পলাশবাড়ীতে সুযোগ পেয়ে আরও ৯৪ লিটার তেল নিয়েছি। কিন্তু ঢাকায় আসার পর শুনি, আলু নিয়ে কুমিল্লা যেতে হবে। প্রথমে কুমিল্লা চকবাজার ও পরে সেখান থেকে নিমসারে এসেছি গতকাল সন্ধ্যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ট্রাক থেকে এখন আলু আনলোড হচ্ছে। ট্যাংকিতে যেটুকু তেল আছে, আশা করছি রংপুরে ফিরে যেতে পারব। আবার পথে আটকে যাই কি না, সেই চিন্তায় আছি।’

রাজুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি ট্রাকের মালিকের সঙ্গে কমিশনে গাড়ি চালান। একটি ট্রিপ শেষে সব খরচ বাদ দিয়ে যত টাকা থাকে, সেটার ২০ শতাংশ তাঁকে দেওয়া হয়। এই ২০ শতাংশ থেকে তিনি চালকের সহযোগীকে একটি অংশ দিয়ে থাকেন। বুধবারের ট্রিপটি ২৬ হাজার টাকায় এসেছেন। তবে বেশি পণ্য পরিবহন করেন রংপুর থেকে ঢাকায়। বর্তমানে তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া সেভাবে বাড়েনি বলে তিনি দাবি করেন।

রাজু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে একটা ট্রিপ দিলে যা আয় হতো, তাতে সংসার মোটামুটি চলত। কোনো কোনো ট্রিপে ৩–৪ হাজারও পেতাম। কিন্তু এখন ট্রিপই অনেক কমে গেছে। আমাদের এলাকায় তিন দিন অপেক্ষার পর তেল না পেলে এই ট্রিপেও আসতে পারতাম না। সবচেয়ে বেশি সমস্যাটা হয় ঢাকায়। তিন ঘণ্টার জ্যাম ও সিরিয়াল পার হয়ে তেলের জন্য পাম্পে গেলে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার তেল দেয়। এই তেল দিয়ে আমাদের মতো দূরের গাড়ির কিছুই হয় না।’

মোহাম্মদ রাজু আরও বলেন, ‘এই তেলের সংকটে বর্তমানে খুবই কষ্টে আছি। ঘরে টাকা দিতে পারি না। গত শনিবার ঘর থেকে বের হইছি; এখনো যাইতে পারি নাই। তেলের সংকট ট্রাকের চাকার মতো আমগো জীবনের চাকাও আটকিয়ে দিতাছে। অন্য কোনো কাম শিখি নাই। না হইলে এই পেশা ছাইড়া দিতাম। এই অবস্থার উন্নতিরও কোনো লক্ষণ দেখতাছি না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় থাকি। কিন্তু আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। যদি তেলের সমস্যা দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে এই পেশায় থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’