‘হামরা গরিব মানুষ, পুরা রমজান মাস টিসিবির মাল পাইলে উপকার হয়’

টিসিবির পণ্য কিনতে উপচে পড়া ভিড়। আজ বুধবার দুপুরে দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় মাঠের দক্ষিণ প্রান্তেছবি: প্রথম আলো

সকাল সাড়ে নয়টা। দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ মাঠের উত্তর প্রান্তে রাস্তার পাশে জনাত্রিশেক নারী-পুরুষের জটলা। বাজারের ব্যাগ আর জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) পণ্যবাহী একটি ট্রাকের অপেক্ষায় তাঁরা। হঠাৎ সাইকেল নিয়ে এলেন একজন। বললেন, ‘মাঠে তারকাঁটার বেড়া দেওয়ায় জায়গা কম, এইঠেনা মাল দিবে না। মেলার মাঠোত (দক্ষিণ প্রান্তে) যাবা হবি।’ তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই দ্রুত পায়ে মেলার মাঠের দিকে ছুটলেন সবাই।

মেলার মাঠে গিয়ে শুরু হলো আরেক দফা অপেক্ষা। কেউ গৃহস্থালির কাজ ফেলে এসেছেন, কেউ বাচ্চাকে নিতে স্কুলে যাবেন, কেউ কাজ থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন। তাঁদের সবার বাড়ি আশপাশের মিশন রোড, দপ্তরি পাড়া, চাতরাপাড়া, ঈদগাহ বস্তি এলাকায়। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা নিজেদের মধ্যে চলল নানান পারিবারিক আলোচনা। অপেক্ষার প্রহর শেষে পণ্যবাহী একটি ট্রাক যখন মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে আমগাছতলায় এসে পৌঁছাল। ঘড়িতে তখন পৌনে ১২টা। সবার চোখেমুখে আনন্দ। কে আগে পরিচয়পত্র জমা দেবেন, চাহিদা অনুযায়ী পণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, এই নিয়ে হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি। টিসিবির ডিলারের কর্মীরা সবার পরিচয়পত্র জমা নিতে শুরু করলে হইহুল্লোড় কিছুটা কমল।

জেলা টিসিবি কার্যালয় সূত্র জানায়, দিনাজপুরে গত মঙ্গলবার থেকে সুলভ মূল্যে টিসিবির পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ মার্চ পর্যন্ত জেলায় ২৫-৩০টি স্থানে পণ্য সরবরাহ করা হবে। প্রতিদিন পাঁচটি স্থানে দুই হাজার মানুষ ৫৯০ টাকায় দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কেনার সুযোগ পাবেন।

পণ্য কিনতে আসা ইয়াসমিন আক্তার নামের একজন নারী বললেন, ‘আমাদের অনেক কষ্ট, ভাই। স্বামী নাই। হামরা গরিব মানুষ। অনেক জায়গায় বেড়াই শুনলাম, বড় মাঠোত টিসিবির মাল দিবে। ৬০০ টাকা আনছি। এই টাকায় চিনি, ডাল, তেল যা পাই নিব।’ পাশে থেকে শেফালী নামের একজন বলে উঠলেন, ‘তেল-চিনি-ডাল-ছোলা-খেজুর মিলিয়া ৫৯০ টাকার প্যাকেজ, এইগুলো জিনিস বাজারত কিনির গেইলে কমের পক্ষে ৯৫০ টাকা লাগিল হয়। সেই হিসাবে গরিব মানুষ গিলার ৩০০ থাকি ৩৫০ টাকা বাঁচি যাছে। পুরা রমজান মাস টিসিবির মাল পাইলে হামার তানে উপকার হয়।’

টিসিবির পণ্য কিনতে এসে অনেকেই স্থায়ী কার্ডের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মিশন রোড এলাকার শেফালী বেগম (৪৮) বলেন, ‘গ্রামের অনেকের নামে টিসিবির কার্ড হয়েছে। প্রতি মাসে কম দামে তাঁরা চাল-ডাল-তেল কিনতে পারেন। আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু কার্ড পাইনি।’ জানালেন, তাঁর স্বামী একজন হোটেল শ্রমিক। ছেলে-মেয়েসহ তাঁদের পাঁচজনের সংসার।

পণ্য নিয়ে ভিড় ঠেলে বের হলেন মাঝবয়সী এক নারী। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি। তাঁর নাম শাহনাজ পারভীন। বাড়ি চাতরাপাড়া এলাকায়। ব্যাগ হাতে দারুণ খুশি শাহনাজ। বলতে শুরু করলেন, ‘জিনিসের যে দাম! এই সময়ে ৩৫০ টাকা কমে এতগুলো বাজার পাইলাম। খুব উপকার হইল।’ তিনি বলেন, ‘আমার তো মোবাইল নাই। টিসিবির স্মার্ট কার্ড করার জন্য মাইনষের নাম্বার দি টিসিবির আবেদন করছিলাম। আমার নাম্বার দিয়া মানুষ মাল পাছে, আমি পাচ্ছি না।’

দিনাজপুর টিসিবি ক্যাম্প অফিসের উপপরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, পবিত্র রমজান উপলক্ষে ৫৯০ টাকার এই বিশেষ প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা উপকৃত হচ্ছেন। আগামী ২০ মার্চ পর্যন্ত এই বিশেষ সেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘দিনাজপুরে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৮ জনকে টিসিবির স্মার্ট কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। এরই মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ কার্ড পেয়েছেন। তাঁরা প্রতি মাসে ৫৪০ টাকায় ৫ কেজি চাল, ২ কেজি ডাল, ২ লিটার ভোজ্যতেল এবং ১ কেজি চিনি পাচ্ছেন। তবে রমজান উপলক্ষে ৫৯০ টাকার এই বিশেষ প্যাকেজ সবার জন্য। যদিও আমরা কার্ডধারীদের এই বিশেষ প্যাকেজ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছি।’