সব প্রার্থীর বাড়ি চিরিরবন্দরে, জয় নির্ধারণ হবে খানসামার ভোটে 

আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটাররা যেকোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট আছে লক্ষাধিক।

আক্তারুজ্জামান মিয়া ও আফতাব উদ্দিন মোল্লা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৪ (খানসামা ও চিরিরবন্দর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী। সবার বাড়ি চিরিরবন্দর উপজেলায়। নিজ এলাকার কমবেশি সবাই ভোট টানবেন। ফলে সবার নজর এখন খানসামা উপজেলার দিকে। এখান থেকে যে প্রার্থী যত বেশি ভোট টানতে পারবেন এবং আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট পাবেন, তাঁর জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি। তবে এ আসনটিতে ‘ধানের শীষ’ ও ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যে মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আক্তারুজ্জামান মিয়া। তিনি ২০০১ সালে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রার্থী হয়েছেন মো. আফতাব উদ্দিন মোল্লা। তিনি দলের সাবেক মজলিসে শুরা সদস্য এবং চিরিরবন্দর উপজেলার পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। অপর দুই প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের নূরুল আমিন শাহ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের আনোয়ার হুসাইন নদভী।

এবার ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ নেই। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটাররা যেকোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। আবার আসনটিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট আছে লক্ষাধিক। ফলে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নানাভাবে সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি আওয়ামী–সমর্থিত ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার টানার চেষ্টা করছেন। ভোট টানতে নিয়মিত পথসভা, সমাবেশ, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।

গত দুই দিনে চিরিরবন্দর উপজেলার হাজিরহাট, বেলতলী, কারেন্টহাট, ভূষিরবন্দর, বৈকুণ্ঠপুর এবং খানসামা উপজেলার প্ল্যান বাজার, কাচিনিয়া বাজার, ভুল্লারহাট এলাকা ঘুরে অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভোটের আলাপ তুলতেই তাঁরা ভোটের হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণের চিত্র তুলে ধরছেন। খানসামা উপজেলার কাচিনিয়া বাজার এলাকার হাফিজুল ইসলাম (৫২) বলেন, ‘সকাল ৭টায় দোকান খুলি, রাত ১২টায় বাড়ি যাই। লোকজনের কথা তো শুনতে পাই। সাধারণ মুসলিম ভোটার এবং আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটাররা অর্ধেক অর্ধেক হয়ে গেছে। হিন্দু ভোটাররা ভাগ হয়েছে আশি আর বিশ। এখানে হিন্দুদের ভোটটাই ফ্যাক্টর; যায় যত বেশি পাবে, জয় তারই হবে।’

খানসামা উপজেলার ভুল্লারহাট এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, ‘খানসামা উপজেলা বিএনপির ঘাঁটি বলা চলে। সর্বশেষ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তিন প্রার্থীকে হারিয়ে সহিদুজ্জামান শাহ (বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি, বর্তমানে বহিষ্কৃত) নির্বাচিত হন। এর আগে দুবার চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তাঁর তো একটা ভোটব্যাংক আছে। অবশ্য এবার তিনি প্রচারণায় মাঠে নেই। এই সুযোগে জামায়াত অনেকটা এগিয়েছে। চার প্রার্থীর বাড়ি একই উপজেলায়। হিসাব অনুযায়ী, খানসামার ভোট যে বেশি পাবে, তার কপাল খুলে যাবে।’

বৈকুণ্ঠপুর এলাকার যুবক নাঈম ইসলাম বলেন, ‘ভাই, নির্বাচনী জনসভাত আর মিছিলত কতজন লোক আসিল, এইটা দেখিয়া ভোটের হিসাব হইবে না। ভোটাররা দম ধরি আছে। এ্যালাই কী বুঝিবেন? বুঝা যাইবে ৯ তারিখের পর। তবে হামার এইঠেনার বিষয়টা পরিষ্কার, আওয়ামী লীগের ভোটার আর হিন্দু ভোটার যেই পথে যাইবে, ওমরায় জিতি যাবে।’ 

এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২১ হাজার ২৭৮ জন। এর মধ্যে খানসামা উপজেলার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৯ জন এবং চিরিরবন্দর উপজেলার ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩১৯ জন। 

নির্বাচনী প্রচারণায় এলাকার বিভিন্ন সমস্যা, রাস্তাঘাট সংস্কার, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নসহ নিজের পক্ষে ভোট টানতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তাঁরা। 

মুঠোফোনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘৫ আগস্টের পর হিসাব করে ৯৬০টি শুধু উঠান বৈঠক করেছি। কারও কারও বাড়িতে দুবার পর্যন্ত গেছি। বিগত দিনে এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে পাশে ছিলাম, আছি। ভোটাররা আমাকে কথা দিয়েছেন। আমি তাঁদের ওপরে আস্থা রাখতে চাই। তারা আমাকে নিরাশ করবেন না। দলীয় নেতা-কর্মীরাও একজোট হয়ে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছে। ইনশা আল্লাহ নির্বাচিত হলে দলীয়ভাবে যে আটটি পরিকল্পনার নির্দেশনা আছে, তা বাস্তবায়ন হবে। তা ছাড়া এই আসনে একবার এমপি ছিলাম। দুটি উপজেলার কোথায় কী সমস্যা আছে, সেটা আমার জানা।’

অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আফতাব উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘একটা অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার উঠেছে। সমাবেশগুলোতে এত মানুষ আসছেন, দেখে অবাক হচ্ছি। যিনি বিগত দিনে এমপি ছিলেন, তিনি সততার কাজ করেননি। ফলে মানুষ আমাদের পক্ষে রায় দেবেন ইনশা আল্লাহ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররাও আমাদের পক্ষে কাজ করছেন।’