নারীদের নৌকাবাইচ ঘিরে কাজলার পাড়ে উচ্ছ্বাস

নৌকাবাইচে কাজলা নদীর বুকে সপাটে বইঠা চালাচ্ছেন নারীরা। হাতিয়াড়া, নড়াইল; ৭ নভেম্বর ২০২৬ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

হেমন্তের বিকেলের মিষ্টি সোনালি রোদে ঝলমল করছে কাজলা নদীর পানি। তার ওপর নৌকায় বসে সপাটে বইঠা চালাচ্ছেন নারীরা। ঢাকঢোলের বাদ্য আর গানের তালে তালে নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। দর্শকদের হর্ষধ্বনিতে মুখর নদীর দুই পাড়। গতকাল শনিবার নড়াইল সদরের শেখহাটি ইউনিয়নের হাতিয়াড়া এলাকায় কাজলা নদীতে ব্যতিক্রমী এই নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এ প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর এগারোখান (নড়াইল ও যশোরের ১১টি গ্রাম নিয়ে গঠিত) এলাকার নারীদের ১৬টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিটি নৌকায় ছয় থেকে সাতজন করে নারী ছিলেন। তাঁদের সহযোগিতা করতে কোনো নৌকায় একজন আর কোনো নৌকায় দুজন পুরুষ ছিলেন।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে নড়াইলের স্থানীয় অলোকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারীদের এই নৌকাবাইচের আয়োজন করে। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে নড়াইলের গুয়াখোলা গ্রামের মুক্তা অধিকারীর দল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয় যথাক্রমে হাতিয়াড়া গ্রামের ববিতা সরকার ও রীনা বিশ্বাসের দল।

এই প্রথম নারীদের নৌকাবাইচ দেখলাম। খুবই ভালো লাগছে। সাধারণত পুরুষেরাই নৌকাবাইচে অংশগ্রহণ করেন। তবে মেয়েরা যে সবকিছুই পারেন, তার প্রমাণ দিতে যে এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন, সেটা অবশ্যই খুব ভালো লাগছে।
—সুস্মিতা ঘোষ, নৌকাবাইচ দেখতে যশোর থেকে আসা দর্শনার্থী

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া একটি নারী দলের প্রধান ছিলেন পুতুল মজুমদার। তাঁর নৌকায় ছিলেন আটজন নারী। সহযোগিতায় ছিলেন দুজন পুরুষ।

ছোটবেলায় ডোঙা (ছোট আকারের নৌকা) চালানো শিখেছেন জানিয়ে পুতুল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বয়েস যহন আনুমানিক পাঁচ, তহন তালগাছের ডোঙা চালানো শিখতাম, বাঁশ-কাঠের বইঠে বানায়ে।’

কাজলার বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে বাইচের নৌকা
ছবি: প্রথম আলো

ওই সময়ের সামাজিক বাধার কথা তুলে ধরে পুতুল মজুমদার বলেন, ‘বাপ-কাহারা তহন তো ওডা পছন্দ করত না। পরে দেহে (দেখে), নারীরাই তো সবকিছু করে, তারপরে আর বারণ করেনি। ২০১৪ সালে আমাগের এলাকার ছোট খালে ছেলেরা নৌকাবাইচ টানে, ওই দেইখে দেইখে আমরা পোথম নৌকা টানিছিলাম। পরে সুলতান (শিল্পী এস এম সুলতান) বাইচেও কয়েকবার গেছি। এখন বাইচে গেলেও কেউ কিছু বলে না। কারণ, নারীরাই তো আজকাল উন্নতি করতিছে।’

নৌকাবাইচে নারীদের আরেকটি নৌকার নেতৃত্বে ছিলেন মনিহর পাল। তিনিও ছোটবেলায় নৌকা চালানো শিখেছেন। মনিহর বলেন, ‘প্রথমে স্বামী বাধা দেতো। কতো (বলত), শাড়ি-কাপড় পরে নদীতে ওসব দরকার নেই। তাই বাইচ দেখতি যাচ্ছি কয়ে নদীতে নৌকা টাইনে চইলে আসতাম। এখন আর বাধা দেয় না।’ তবে তিনি বলেন, ‘এর পর থেকে নারীদের বাইচে হাল ধরার জন্যি যে পুরুষেরা ছিল, আগামীতে যেন তারা না থাকে। পুরোটাই নারীদের হাতে দিতে হবে।’

নৌকাবাইচ ঘিরে নদীর পাড়ে বসে হরেক রকমের দোকান। পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। বাঁশ ও বেতের তৈরি চালুনি, ঝুড়ি, থামা, কুলাসহ নানা সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন ষাটোর্ধ্ব রুমি রানী। তিনি বলেন, ‘কুলা, ডালা এগুলো বিক্রি করি। এখানের মেলায় এসেছি। অনেকেই কিনে নিচ্ছেন।’

কাজলা নদীতে নারীদের নৌকাবাইচের আরেকটি মুহূর্ত
ছবি: প্রথম আলো

শুরুটা ২০০৯ সালে

২০০৯ সালে এগারোখানের নারীদের নিয়ে প্রথম নৌকাবাইচ শুরু হয়েছিল অলোকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে। কেন্দ্রের সভাপতি বনানী বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের এগারোখানের অধিকাংশ মেয়েই ছেলেবেলা থেকে ডোঙা ও নৌকা বাইতে পারে। পুরুষদের বাইচ দেখার পর তাই মনে হয়েছে, আমাদের এলাকার নারীদের নিয়েও আয়োজন করা যেতে পারে। সেই চিন্তা থেকে আমরা ২০০৯ সালে এলাকার নারীদের দিয়ে চারটি নৌকা নিয়ে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন শুরু করেছিলাম।’

বনানী বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর আমরা বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তারা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয়ভাবে নৌকাবাইচের আয়োজন করে। স্থানীয়ভাবে অলোকাপুরীর মেয়েরা এই আয়োজন করে। এই প্রতিযোগিতায় মোট ১৭টি নৌকা এসেছিল। কিন্তু জোড়া না মেলায় আমরা ১৬টি নৌকা দিয়ে প্রতিযোগিতা করেছি।

‘সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই’

নারীদের নৌকাবাইচের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্ম গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে। আমরা বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে আনতে চাই। এগুলোকে দেশের ভেতরে–বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামীমুজ্জামান। এ সময় নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নেওয়াজ হালিমা, মাহমুদা হাবিবা ও ফাহমিদা হক, পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক মো. গনী উল আজম, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক লিংকন বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

নারীদের নৌকাবাইচ দেখতে কাজলার পাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়
ছবি: প্রথম আলো

এর আগে গত শুক্রবার বিকেলে নড়াইলের বড়দিয়ায় নবগঙ্গা নদীতে স্থানীয় ব্যক্তিদের আয়োজনে পুরুষদের নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বেশ কয়েকটি নৌকা আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি নৌকা অংশ নেয়। তবে দর্শনার্থী এসেছিলেন কয়েক হাজার।

নারীদের নৌকাবাইচ দেখতে নড়াইল ও যশোরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন হাতিয়াড়া এলাকায় কাজলা নদীর পাড়ে। যশোর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইচ দেখতে আসা সুস্মিতা ঘোষ বলেন, ‘এই প্রথম নারীদের নৌকাবাইচ দেখলাম। খুবই ভালো লাগছে। সাধারণত পুরুষেরাই নৌকাবাইচে অংশগ্রহণ করেন। তবে মেয়েরা যে সবকিছুই পারেন, তার প্রমাণ দিতে যে এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন, সেটা অবশ্যই খুব ভালো লাগছে।’